খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়ার সদর উপজেলায় পদ্মা নদীর চরের ৬ জায়গা থেকে এক যুবকের লাশের ৯টি টুকরা উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত যুবকের নাম মিলন হোসেন (২৪)। মিলন হোসেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাহিরমাদি গ্রামের মাওলা বক্স সরদারের ছেলে। লাশের টুকরোগুলো সাতটি ব্যাগে রাখা ছিল। শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ২টা থেকে শনিবার (৩ ফেব্র“য়ারি) সকাল ৯টা পর্যন্ত পদ্মার চরে অভিযান চালিয়ে এগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশের টুকরাগুলো কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। মিলন হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক ছয়জনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) বিকেল ৫টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশের একটি বহর গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে আদালতে হাজির করে। পরে রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চার আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে নেওয়া আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি সজীব শেখ (২৪), কুমারগাড়া এলাকার ফয়সাল আহমেদ (২৫), দেশওয়ালীপাড়ার কাজী লিংকন (৩২), সদর উপজেলার কান্তিনগর গ্রামের জনি প্রামাণিক (২১), হাউজিং সি ব্লকের ইফতি খান ও ডি ব্লকের সজল ইসলাম (১৮)। পরে রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চার জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত। ঐ চার জন আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে দন্ডবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। পুলিশ বাকি দুই আসামী সজীব শেখ ও ইফতি খান বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। গতকাল সোমবার রিমান্ড আবেদন শুনানির কথা থাকলে তা হয়নি। তবে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার, ৬ ফেব্র“য়ারি) রিমান্ড শুনানি হবে। জানা যায়, ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সজীব শেখ ও তাঁর সহযোগীরা বাসা ভাড়া নিয়ে নানা অপকর্ম করে আসছিলেন। তবে এ নিয়ে কেউ কিছু বলেননি। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, সজীবসহ কয়েকজন কুষ্টিয়া হাউজিং এলাকার সাততলা ভবনের ছয়তলা ভাড়া নিয়েছিলেন। ওই বাসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের। ব্যবসার জন্য অফিস করার কথা বলে বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়।
রোববার দুপুরের দিকে কুষ্টিয়া হাউজিং এলাকার ওই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, গেটে কোনো দারোয়ান নেই। ডেকেও কাউকে পাওয়া যায়নি। আশপাশের লোকজন তাঁদের বিষয়ে জানলেও কেউ কখনো মুখ খোলেননি। ওই বাড়ির কাছের এক মুদিদোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে এ বাসায় অনেকে যাতায়াত করতেন। সবাই কম বয়সী ছেলে। মাদক সেবনসহ নানা অপকর্ম করলেও কেউ কখনো বিষয়টি আমলে নেননি। তবে সজীবের পরিবারের দাবি, তিনি মারধরের মতো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কাউকে হত্যা করতে পারেন, এটা তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। শহরের হাউজিং এলাকায় সজীবদের ভাড়া বাসায় গিয়ে কথা হয় তাঁর মা, বোন ও স্ত্রীর সঙ্গে। মা দাবি করেন, ‘আমার ছেলে মারধর-মারামারি করে, এটা ঠিক আছে। তবে হত্যা করতে পারে, এটা বিশ্বাস করি না। তার অনেক শত্র“, কেউ তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। নিহত মিলনের সঙ্গে আমার ছেলের কোনো ব্যবসা ছিল না। বন্ধুরা তাকে ডেকে নিয়ে যেতে পারে। থানায় জিডির পর থেকে লাশ উদ্ধার ও জড়িতদের ধরার অভিযানে নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস ও মিডিয়া) পলাশ কান্তি নাথ। পুলিশের এই কর্মকর্তাসহ আরও ২-৩ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়। গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফোন করে মিলনকে অফিসে ডেকে নেন তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার সজল। সেখানে আগে থেকে সজীবসহ কয়েকজন অবস্থান নিয়েছিলেন। অফিসে যাওয়ার পর মিলনের কাছে চাঁদা দাবি করেন সজীব। ভয়ভীতি দেখাতে তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে মুখে গামছা গুঁজে নাক চেপে ধরেন। ঘটনাচক্রে মিলন মারা যান। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মিলনকে হত্যার সময় ওই অফিসের দুটি কক্ষে সজীবসহ অন্তত ১০ থেকে ১১ জন ছিলেন। সেখানে দুটি কক্ষে তাঁরা অবস্থান নেন। লাশ গুম করতে সজীব পরিকল্পনার কথা জানান তাঁদের। এ সময় একজনকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে তালা লাগিয়ে বাইরে চলে যান। বাকিরা ঘরের ভেতর থাকেন। দেড় ঘণ্টা ধরে শহরের তিনটি দোকান থেকে লাশ কাটার জন্য হেক্সা ব্লেড, পলিথিন ব্যাগ ও রক্ত পরিষ্কারের জন্য জীবাণুনাশক কেনেন। বিকেল পাঁচটার দিকে আবার অফিসে ফিরে আসেন। পরে দুর্বলচিত্তের ৪-৫ জনকে পাশের কক্ষে রাখেন। সজীবসহ ৪-৫ জন মিলে একটি করে বাথরুমে লাশ নিয়ে টুকরা করেন। প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে লাশ কেটে তাঁরা ব্যাগে ভরেন। পুলিশ জানায়, রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাঁরা চারটি মোটরসাইকেলে সাতজন ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আসেন। বাকিদের সজীব যে যার মতো বাড়ি চলে যেতে বলেন এবং বিষয়টি কাউকে না জানাতে হুমকি দেন। পুলিশ শহরের কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তাতে দেখা গেছে, রাত ৯টা ৩২ মিনিটের দিকে চারটি মোটরসাইকেলে সাতজন শহরের ছয়রাস্তা মোড় হয়ে হরিপুর সেতু দিয়ে পদ্মার চরের দিকে চলে যান। রাত ১১টার মধ্যে লাশের টুকরাগুলো পদ্মার চরে বালুচাপা দিয়ে যে যাঁর মতো বাড়ি চলে আসেন। সবাই স্বাভাবিকভাবে শহরে চলাফেলা করতে থাকেন। কেউ পালানোর চেষ্টা করেননি।