খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 17শে মাঘ ১৪৩২ | ৩০ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে গত কয়েক বছরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে অবৈধ অস্ত্রের এই ঝনঝনানি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার বছরে জেলায় ২৪৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৩ জনকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহেই দুই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এই শঙ্কা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
যশোরে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে এবং পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭.৬৫ মিলিমিটার বোরের পিস্তলের আধিপত্য দেখা গেছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই অস্ত্রগুলোর গায়ে ‘মেইড ইন ইতালি’ বা ‘ইউএসএ’ লেখা থাকলেও এগুলো মূলত প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে এই অস্ত্রগুলো যশোরে প্রবেশ করছে এবং অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
নিচে গত কয়েক বছরের হত্যাকাণ্ড ও উদ্ধারকৃত অস্ত্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
সারণি: যশোরে গত চার বছরের হত্যাকাণ্ড ও উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের পরিসংখ্যান
| বছর | মোট হত্যাকাণ্ড (জন) | গুলি করে হত্যা (জন) | উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের বিবরণ |
| ২০২২ | ৫৫ | ২ | বিবিধ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র |
| ২০২৩ | ৪২ | ২ | ৮টি পাইপগান ও কার্তুজ |
| ২০২৪ | ৮৩ | ৪ | ১৯টি বিদেশি পিস্তল (সর্বোচ্চ) |
| ২০২৫ | ৬০ | ৩ | ৪টি দেশি পিস্তল ও ২৯০টি গুলি |
| ২০২৬ (জানু.) | ৩ | ২ | ৭.৬৫ মিলিমিটার বোরের পিস্তল |
মামলার এজাহার এবং পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যশোরে হত্যাকাণ্ডের কারণগুলো বহুমুখী। গত এক বছরে নিহত ৬০ জনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পারিবারিক কলহ সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে (১২ জন)। এছাড়া আধিপত্য বিস্তার (৭ জন), মাদক ব্যবসা (৩ জন) এবং পূর্বশত্রুতা (৪ জন) অন্যতম। বাকি ঘটনাগুলো জমিজমা ও ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে ঘটেছে।
আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও প্রকট হয়ে উঠছে। গত ৩ জানুয়ারি যশোর শহরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন এবং ৫ জানুয়ারি মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও বিগত বছরগুলোতে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মী-নেতা একই কায়দায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে এবং নির্বাচনের আগে কোনো ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা পুলিশের এই আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
বিএনপির যশোর-৩ আসনের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অভিযোগ করেছেন যে, তারা বারবার তাগিদ দিলেও পুলিশের তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ একটি গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে সীমান্ত দিয়ে আসা নতুন অস্ত্র এবং অন্যদিকে লুট হওয়া অস্ত্র—সব মিলিয়ে আগামী দিনে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যশোর প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেবল পুলিশ নয়, বিজিবি ও র্যাবের সমন্বিত গোয়েন্দা নজরদারি ছাড়া এই অস্ত্রের প্রবেশপথ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নতুবা নির্বাচনের প্রাক্কালে পেশিশক্তির লড়াইয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সাধারণ মানুষের জানমালের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।