খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
‘হাজার চুরাশির মা’-এর স্রষ্টা
মহাশ্বেতা দেবী
বাংলা সাহিত্য ও মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে মহাশ্বেতা দেবী এক অনন্য উচ্চারণ। তিনি শুধু একজন শক্তিমান কথাসাহিত্যিকই নন, ছিলেন নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর—বিশেষ করে সাঁওতালসহ ভারতের প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও শোষিত নারীদের পক্ষে এক আপসহীন যোদ্ধা।
তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল সুর ছিল প্রতিবাদ, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বোধ। শতাধিক গ্রন্থের ভেতরে উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এক মায়ের অন্তর্গত বেদনা ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক অনিবার্য ক্লাসিক হয়ে উঠেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬, তৎকালীন ঢাকায়, এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক মধ্যবিত্ত পরিবারে।
তাঁর পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের খ্যাতিমান সাহিত্যিক এবং কাকা ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক—যাঁর শিল্পচেতনা মহাশ্বেতা দেবীর মনন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
শিক্ষাজীবনের সূচনা শান্তিনিকেতনে। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৬৪ সালে তিনি বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সময়ে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি কেবল লেখক নন, হয়ে ওঠেন মাঠপর্যায়ে কাজ করা একজন মানবাধিকার কর্মী—যিনি আদিবাসী গ্রাম থেকে আদালত পর্যন্ত লড়াই করেছেন।
সাহিত্য ও আন্দোলন
মহাশ্বেতা দেবীর লেখালেখির কেন্দ্রে ছিল আদিবাসী সমাজের ভূমি অধিকার, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, নারীর শরীর ও শ্রমের ওপর দখলদারি, এবং ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া সত্য। তিনি বিশ্বাস করতেন—
“লেখা মানে কেবল শিল্প নয়, লেখা মানে দায়িত্ব।”
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে—
অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুণ্ডা ও তার তীর, স্তনদায়িনী, রুদালী, তিতু মীর, বন্দোবস্তী, ব্যাধখণ্ড, শিকার পর্ব, গণেশ মহিমা, নৈঋতে মেঘ, অগ্নিগর্ভ, প্রস্থানপর্ব, ঊনত্রিশ নম্বর ধারার আসামি, হাজার চুরাশির মা—সহ বাংলা ও ইংরেজিতে রচিত বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন—
র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৯৭)
জ্ঞানপীঠ পুরস্কার
পদ্মবিভূষণ (২০০৬)
সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭)
এই পুরস্কারগুলো কেবল সাহিত্যিক স্বীকৃতি নয়, তাঁর মানবিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও।
ব্যক্তিজীবন
মহাশ্বেতা দেবীর স্বামী ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্য। তাঁদের একমাত্র সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্য—বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর।
শেষকথা
জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনসহ বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন নির্ভীকভাবে সম্মুখসারিতে। কলম ও কর্ম—দুটোকেই তিনি সমানভাবে ব্যবহার করেছেন শোষিত মানুষের পক্ষে।
২৮ জুলাই ২০১৬—এই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেও, তাঁর লেখা ও লড়াই আজও জীবিত।
মহাশ্বেতা দেবী থাকবেন—
প্রতিবাদের ভাষায়,
মানবতার সাহিত্যে,
আর ইতিহাসের নৈতিক বিবেক হিসেবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।