খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ মে ২০২৫
দেশজুড়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের উপবৃত্তি কার্যক্রম নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কবলে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত এই অর্থ এখন অনেক ক্ষেত্রে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর সংশ্লিষ্টদের পকেটে।
সূত্র জানায়, বিগত সরকার একচ্ছত্রভাবে নগদকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তি বিতরণের দায়িত্ব দেয়। বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের নির্দেশে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এই দায়িত্ব বহাল রয়েছে নগদের হাতে। তবে নানা অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এই একচেটিয়া দায়িত্ব নবায়ন করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনেক সময় কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তি প্রদর্শিত হলেও বাস্তবে সেই টাকা পৌঁছায় না। অনেক অভিভাবকের মোবাইল নম্বর বন্ধ বা অচল থাকায় উপবৃত্তির টাকা ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও সেসব অর্থ ফেরত গেছে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকে তো জানেনই না যে তাদের সন্তান উপবৃত্তির টাকা পাওয়ার কথা ছিল।
এদিকে, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে নগদের এজেন্ট সংকটও অভিভাবকদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। অনেক জায়গায় অভিভাবকদের নগদ অ্যাকাউন্টই নেই, ফলে তারা টাকা তুলতেই পারছেন না। এই সুযোগে কিছু অসাধু শিক্ষক নিজেদের মোবাইল নম্বরেই উপবৃত্তির টাকা তুলে আত্মসাৎ করছেন।
জয়পুরহাট ও নেত্রকোনার দুই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে উপবৃত্তি আত্মসাতের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাতক্ষীরার এক মাদরাসা অধ্যক্ষও শিক্ষার্থীদের সিম নিজের কাছে রেখে টাকা আত্মসাতের দায়ে বরখাস্ত হয়েছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, উপবৃত্তি নিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নগদের বিরুদ্ধে ২,৩৫৬ কোটি টাকার দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি এবং ১,৭১১ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দুদক নগদের বনানী অফিসে অভিযান চালিয়ে এসব তথ্যের প্রমাণ পায়।
নগদের সিস্টেমে দুর্বলতা এবং কিছু অসাধু এজেন্টের কারণে উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে। যশোর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনার প্রমাণ মিলেছে।
উপবৃত্তি দেওয়ার শর্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মাসে ৮৫% উপস্থিতি এবং বার্ষিক পরীক্ষায় ৪০% (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৩%) নম্বর পেতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসার শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নাম লিখিয়ে ক্লাস না করেও উপবৃত্তি পাচ্ছে। এমনকি কিছু শিক্ষক নিজের পছন্দমতো নাম অন্তর্ভুক্ত করে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করছেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, “উপবৃত্তির পেছনে সরকারের ব্যয় কম নয়। কিন্তু এই কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না। অনেক শিক্ষার্থী নামমাত্রভাবে প্রাথমিক স্কুলে নাম লেখায়, কিন্তু পড়ে অন্যত্র।”
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা মাসে ৭৫ টাকা, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ১৫০ টাকা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা মাসে ২০০ টাকা করে উপবৃত্তি পায়। ষষ্ঠ থেকে স্নাতক পর্যায়ের ৬০ লাখ ৭১ হাজার শিক্ষার্থীকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপবৃত্তির অর্থ ছাড় করা হয়েছে। এক পরিবারে সর্বোচ্চ দুই শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পেতে পারে।
নগদের সঙ্গে উপবৃত্তি বিতরণ চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হবে। এরপর এই দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে তা এখনও অনিশ্চিত। সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির স্কিম পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুল হক জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত সরকারের।
খবরওয়ালা/এমএজেড