জেড আই খান পান্না
প্রকাশ: 20শে ভাদ্র ১৪৩২ | ৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর জন্মদিন ছিল গত ১ সেপ্টেম্বর।
আমরা অতি উৎসাহী কিছু মানুষ না বুঝে প্রধান সেনাপতিপতিকে, সর্বাধিনায়ক হিসেবে সম্বোধন করে ইতিহাসকে বিকৃত করি। কেউ কেউ আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের “সর্বাধিনায়ক” বলে প্রচার চালাচ্ছে। এই প্রচার দেখে কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং একই কথা লিখছেন। আমাকে এমনকি কয়েকজন ফোন করেও এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। তাই মনে হলো বিষয়টি নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পরিষ্কার করা জরুরি।
ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা আমাদের একমাত্র সমস্যা নয়। আরও বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যুদ্ধনীতি এবং সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণার অভাব। এর ফলেই আমরা প্রায়ই অবাস্তব ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ফাঁদে পড়ি।
আমাদের বোঝা উচিত যে, যেকোনো যুদ্ধে সর্বাধিনায়ক হন রাষ্ট্রপ্রধান। কারণ তিনি কেবল সামরিক বাহিনীর নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের প্রতীক। অপরদিকে সামরিক প্রধান কেবল সামরিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন, এবং সেটিও সর্বাধিনায়কের অধীনে। যুদ্ধ কখনোই শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; কূটনীতি, প্রচার, অর্থনীতি, প্রশাসন। সব ক্ষেত্রেই যুদ্ধ পরিচালনা হয়। এসব ক্ষেত্র সমন্বয় করেন সর্বাধিনায়ক অথবা তার নামে, তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
এই কারণেই “সেনাপতি” ও ‘সর্বাধিনায়ক’ শব্দের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেনাপতি মানে সেনাবাহিনীর প্রধান, আর সর্বাধিনায়ক মানে রাষ্ট্রপ্রধান। তাই আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বলা ইতিহাস বিকৃতির শামিল।
আতাউল গণি ওসমানীর কর্মজীবন সম্পর্কেও কিছু তথ্য পরিষ্কার হওয়া দরকার। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কর্নেল পদে অবসর নেন। পাকিস্তান আমলে এর চেয়ে উঁচু পদে কোনো বাঙালির ওঠার সুযোগ তখন প্রায় ছিল না বললেই চলে। বাঙালিদের মধ্যে পাকিস্তান আমলে সর্বোচ্চ “ব্রিগেডিয়ার” পদে পৌঁছাতে পেরেছিলেন একমাত্র ব্রিগেডিয়ার মজুমদার।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সিনিয়র বাঙালি সেনা কর্মকর্তাকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে প্রয়োজন ছিল। সেসময় সার্ভিসে থাকা অফিসারদের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মজুমদার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে পাকিস্তানে কারারুদ্ধ হন।
ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতি অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে পদ ও বয়সে সবচেয়ে সিনিয়র ছিলেন ওসমানী। পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যও ছিলেন। তিনি অবসরে থাকলেও সব মিলিয়ে তাকে সেনাপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর অন্যান্য এমএসএদের মতো ওসমানীও সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। ১১ এপ্রিল ১৯৭১-এ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গঠনের ঘোষণা দেন এবং এম. এ. জি. ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। পরবর্তীতে, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে ওসমানীকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জেনারেল পদে ভূষিত করে। বাংলাদেশের সরকারি গেজেটেও সেই সিদ্ধান্তই উল্লিখিত আছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু আবেগ নয়, সঠিক তথ্য ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতেই বুঝতে হবে। সর্বাধিনায়ক ও সেনাপতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । সর্বাধিনায়ক ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আর মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন এম. এ. জি. ওসমানী।
ওসমানীর নেতৃত্ব, সংগঠন শক্তি ও অবদানের গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু তাকে ‘সর্বাধিনায়ক’ বলা হলে তা ইতিহাসের বিকৃতি হয়ে দাঁড়ায়। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো আবেগ নয়, সত্য ও দলিলভিত্তিক ইতিহাস জানা এবং প্রচার করা। যাতে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রপাগান্ডা আর কখনোই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী