এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 2শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৭ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আজ ১৭ আগস্ট, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকী।
২০০৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরে তাকে সমাহিত করা হয়।
জন্ম ও শৈশব
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরোনো ঢাকার মাহুতটুলি নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল ‘বাচ্চু’। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মা আমেনা বেগম। পুরোনো ঢাকায় বেড়ে ওঠার কারণে নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ ও অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষা ও ব্যক্তিজীবন
১৯৪৫ সালে পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও শেষ পরীক্ষা দেননি। ১৯৫৩ সালে বিএ পাস কোর্সে স্নাতক হন এবং এমএ (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় ভালো ফল করেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেননি।
১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই তিনি জোহরা বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের পরিবারে তিন কন্যা ও দুই পুত্র।
সাংবাদিকতা জীবন
পেশাজীবনে তিনি সফল সাংবাদিক। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রেডিও পাকিস্তান-এ অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে কাজ করলেও আবার সংবাদপত্রে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দৈনিক পাকিস্তান (স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলা) ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা-এর সম্পাদক হন।
সাহিত্যচর্চা ও সংগ্রামী কবিতা
শামসুর রাহমান মূলত কবিতার মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করেছেন। শিশুসাহিত্যের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে লেখেন ‘হাতির শুঁড়’ কবিতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কারাগারে থাকাকালে লেখেন বিখ্যাত কবিতা ‘টেলেমেকাস’। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ হলে তিনি স্বাক্ষর করেন প্রতিবাদী বিবৃতিতে। ১৯৬৮ সালে অভিন্ন রোমান হরফ প্রবর্তনের বিরুদ্ধে লিখেন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদকে উৎসর্গ করে রচনা করেন ‘আসাদের শার্ট’। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লেখেন অনবদ্য কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’।
স্বৈরশাসনবিরোধী অবস্থান
১৯৮৭ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে তিনি দৈনিক বাংলা-এর প্রধান সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তী চার বছরে লিখেছেন ধারাবাহিক প্রতিবাদী কবিতা; শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা
উত্তরাধিকার
শামসুর রাহমান ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি। মৌলবাদী গোষ্ঠীর একাধিক হামলা ও হুমকি সত্ত্বেও তিনি তার আদর্শ থেকে সরেননি। বাংলা কবিতায় তিনি নগরজীবনের কণ্ঠস্বর, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতার চেতনার অনন্য প্রকাশক হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
আজ এই দিনে এই মহান নগর কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।