খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চলে ইঁদুরের উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে, যা বর্তমানে মহামারী হিসেবে রূপ নিয়েছে। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ সংকটে দেশটির শস্য উৎপাদনকারী কৃষকেরা চরম আতঙ্ক ও ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ইঁদুরের দল ফসলের মাঠ ধ্বংস করার পাশাপাশি লোকালয় ও ঘরবাড়ির চারপাশে অবাধে বিচরণ করছে। এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের ইতিমধ্যে লাখ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। ইঁদুরে নষ্ট করা জমিতে কৃষকদের পুনরায় ফসল রোপণ করতে হচ্ছে অথবা বীজ বপনের পর ইঁদুর মারার বিষ মিশ্রিত ‘জীবাণুমুক্ত বীজ’ জমিতে ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মিনজেনিউপ এলাকায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির একটি খামার পরিচালনা করেন ৪৩ বছর বয়সী জিওফ কসগ্রোভ। তিনি মূলত গম, ক্যানোলা, লুপিন ও যব চাষ করেন। কসগ্রোভের মতে, ইঁদুর দমনে শুধুমাত্র বিষ ক্রয়ের পেছনেই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে না, বরং এর সাথে পুনরায় শ্রম ও পুনঃবপনের মতো আরও বড় আর্থিক ব্যয় জড়িত রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই পরিস্থিতি খামারিদের জন্য মানসিকভাবেও অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। রাতের বেলায় ইঁদুরের দল ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ভেতর এবং মানুষের মাথার ওপর দিয়ে চলাচল করে। সর্বত্র ইঁদুরের অবাধ বিচরণ, শব্দ এবং মৃত ইঁদুরের পচা দেহের দুর্গন্ধ এক দুর্বিষহ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
কসগ্রোভ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, চলমান এই পরিস্থিতি ২০২১ সালের মহামারীর চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ।
২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ডের একটি বৃহৎ অংশে ইঁদুরের ঐতিহাসিক মহামারী দেখা দিয়েছিল, যা ওই অঞ্চলের কৃষিখাতে নজিরবিহীন ক্ষতিসাধন করে। তৎকালীন পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি কারাগারের অভ্যন্তরে ইঁদুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করায় শত শত বন্দিকে সাময়িকভাবে অন্য কারাগারে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল।
চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রথমে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই উপদ্রব দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াতেও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কৃষক বেলিন্ডা ইস্টাফ সাড়ে ৫ হাজার হেক্টরের একটি খামারে কর্মরত আছেন, যা কসগ্রোভের খামার থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত ইস্টাফ মূলত গম, ক্যানোলা ও লুপিন চাষ করেন। তাঁর উৎপাদিত গম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উডন নুডলস তৈরিতে রপ্তানি হয় এবং দেশীয় বাজারে বিস্কুট, রুটি ও পাস্তা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ইস্টাফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর আগে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় যে ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়েও মারাত্মক। ২০২১ সালের মহামারীর সময় ইঁদুরের উপস্থিতি মানুষের হাতব্যাগ, মেঝে, দেয়াল এবং খাবার সংরক্ষণের আলমারিসহ সব জায়গায় ছিল। তবে এবার তারা ঘরবাড়ির চেয়ে সরাসরি ফসলের মাঠে তথা খাদ্যের উৎসের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ ফসল উৎপাদন হয়েছিল, যার ফলে কাটার পর জমিতে প্রচুর শস্য অবশিষ্ট বা ছিটকে পড়ে থাকে। এটি ইঁদুরের জন্য সহজ ও পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে। এরপর গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাতের কারণে মাঠে প্রচুর নতুন সবুজ ঘাস ও উদ্ভিদের জন্ম হয়। পর্যাপ্ত শস্য এবং সবুজ উদ্ভিদের এই সহাবস্থান ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ইস্টাফ অনুমান করছেন, বর্তমানে তাঁর ক্যানোলা ক্ষেতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০টি ইঁদুর অবস্থান করছে। সাধারণত খাদ্যের অভাব দেখা দিলে ইঁদুরের সংখ্যা হ্রাস পায়, কিন্তু এবার পর্যাপ্ত খাদ্যের কারণে সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
শরৎকাল শস্য চাষিদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়েই নতুন ফসলের বীজ রোপণ করা হয়। কৃষি উপদেষ্টা হিসেবে ইস্টাফ চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন যেন তারা বীজ বপন করার অব্যবহিত পরেই জমিতে বিষ প্রয়োগ করেন। যদি বীজ রোপণের পর দ্রুত বিষ প্রয়োগ না করা হয়, তবে রাতের বেলা ইঁদুর এসে মাটির নিচ থেকে বীজ খেয়ে ফেলে। ফলে রাতে বপন করা জমিতে পরদিন সকালে ফসলের কোনো অস্তিত্ব বা সারি খুঁজে পাওয়া যায় না।
কৃষকেরা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কৃষকদের দুই-তিন মাস আগের তুলনায় দ্বিগুণ মূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয় করতে হচ্ছে। এই বর্ধিত উৎপাদন খরচের ওপর ইঁদুরের মহামারী কৃষকদের জন্য নতুন ও দ্বিগুণ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা ‘সিএসআইআরও’ (CSIRO)-এর গবেষক এবং ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ স্টিভ হেনরি চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান করেছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি হেক্টরে ইঁদুরের সংখ্যা ৮০০-তে পৌঁছালে সেটিকে মহামারী হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বর্তমানে পশ্চিম ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার কৃষিজমিতে এই সংখ্যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহু গুণ বেশি।
সম্প্রতি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সফরকালে স্টিভ হেনরি মাত্র ১০০ মিটার পথ চলার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০টি সক্রিয় ইঁদুরের গর্ত সনাক্ত করেছেন। এই গাণিতিক হিসাব অনুয়ায়ী প্রতি হেক্টরে বর্তমানে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০টি ইঁদুরের সক্রিয় গর্ত রয়েছে।
নিচে অস্ট্রেলিয়ার ইঁদুর মহামারী সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও তথ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
| সূচক / বিবরণ | স্বাভাবিক বা পূর্ববর্তী পরিস্থিতি | বর্তমান মহামারী পরিস্থিতি (পশ্চিম ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া) |
| মহামারী ঘোষণার মানদণ্ড | প্রতি হেক্টরে ৮০০টি ইঁদুর | প্রতি হেক্টরে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০টি ইঁদুর (ক্যানোলা ক্ষেত) |
| সক্রিয় গর্তের সংখ্যা | স্বাভাবিক মাত্রায় নগণ্য | প্রতি ১০০ মিটারে ৩০-৪০টি (হেক্টর প্রতি আনুমানিক ৩,০০০-৪,০০০টি) |
| আক্রান্ত মূল অঞ্চলসমূহ | ২০২১ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুইন্সল্যান্ড | ২০২৬ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া |
| প্রধান খাদ্যের উৎস | সাধারণ শস্য | গত বছরের উদ্বৃত্ত শস্য এবং গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টির ফলে গজানো সবুজ উদ্ভিদ |
| কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ | স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয় | বীজ পুনঃবপন, বিষ প্রয়োগের খরচ এবং দ্বিগুণ মূল্যের জ্বালানি তেল |
| প্রধান উৎপাদিত শস্য | – | গম, ক্যানোলা, লুপিন ও যব |