খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৫ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক তহবিল কমে যাওয়ার সরাসরি অভিঘাত হিসেবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে—যা চলতি শতকের অগ্রগতির গতিপথ উল্টো ঘুরিয়ে দিচ্ছে। দাতব্য সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশন তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর সংখ্যা অতিরিক্ত ২ লাখ বাড়তে পারে। এই ধাক্কা শুধু একটি সাময়িক প্রবণতা নয়; বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গভীর আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
গেটস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যু কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০২৩ সালে মারা যাওয়া শিশুদের সংখ্যা আনুমানিক ছিল ৪৬ লাখ। কিন্তু ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ৪৮ লাখে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অগ্রগতির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এই বৃদ্ধি বিশেষজ্ঞদের কাছে উদ্বেগজনক এ কারণে যে, কয়েক দশক ধরে শিশুস্বাস্থ্যে টিকাদান, অপুষ্টি মোকাবিলা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এখন বিপরীত দিকে যাচ্ছে।
বিল গেটস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—“বিশ্ব গত কয়েক দশকে ধীর কিন্তু স্থায়ী অগ্রগতি দেখেছে। কিন্তু এখন সেই অর্জনটাই বিপরীত দিকে ঘুরছে।”
এই সংকটের মূল কারণ হলো স্বাস্থ্যখাতে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।
২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য তহবিল কমায়
এরপর যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অন্যান্য বড় দাতা দেশও একই পথে হাঁটে
গেটস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরে স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা কমেছে ২৭%। এটি গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সংকোচন।
বিশ্বের বহু নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ বর্তমানে ঋণের ভারে জর্জরিত। ফলে তারা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। তার ফলে—
রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি স্থবির
প্রয়োজনীয় টিকা ও ওষুধ সংগ্রহে ব্যয় সংকোচন
নবজাতক ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় ভাঙন
স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি ও অবকাঠামো দুর্বল হওয়া
সব মিলিয়ে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গেটস ফাউন্ডেশন সতর্ক করে বলছে—
যদি বর্তমান তহবিল সংকট অটুট থাকে, তাহলে ২০৪৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। এটি শুধু একটি মানবিক বিপর্যয়ই নয়; বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার বড় প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার করতে হবে
ঋণগ্রস্ত দেশগুলোকে জরুরি সহায়তা দিতে হবে
টিকা, পুষ্টি ও মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার বাড়াতে হবে
বৈশ্বিক মহামারি–পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে
বিশ্লেষকদের মতে, শিশু মৃত্যুর এই সম্ভাব্য বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মানবসভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা উচিত। বিশ্ব যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর পাহাড় আরও উঁচু হয়ে উঠবে।