খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার নারীদের অধিকার সংকুচিত করে এবং পারিবারিক সহিংসতাকে এক প্রকার ‘বৈধতা’ দিয়ে একটি বিতর্কিত নতুন ফৌজদারি আইন বা দণ্ডবিধি জারি করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নতুন এই আইন অনুযায়ী, আফগান স্বামীরা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর শারীরিক শক্তি প্রয়োগ বা মারধর করার আইনি অনুমতি পাচ্ছেন, যতক্ষণ না সেই আঘাতের ফলে কোনো হাড় ভাঙছে বা গুরুতর দৃশ্যমান জখম তৈরি হচ্ছে।
পশতু ভাষায় এই দণ্ডবিধিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা’, যার অর্থ ‘আদালতের ফৌজদারি বা দণ্ডবিধি সংক্রান্ত নিয়মাবলী’। প্রায় ৯০ পৃষ্ঠার এই বিশাল নথিটিতে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা স্বাক্ষর করেছেন। এই আইনটি বর্তমানে আফগানিস্তানের আদালতগুলোতে বিচারিক কার্যক্রমের গাইডলাইন হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই আইনের মাধ্যমে দেশটিতে পারিবারিক সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই দণ্ডবিধির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি আফগান সমাজকে চারটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। অপরাধের দণ্ড নির্ধারিত হবে অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে, অপরাধের গুরুত্বের ওপর নয়।
নিচে নতুন আইনের অধীনে সামাজিক শ্রেণিবিভাগ ও প্রভাবের একটি ছক দেওয়া হলো:
| সামাজিক শ্রেণি | শ্রেণির বিবরণ | শাস্তির প্রকৃতি ও প্রভাব |
| উলামা (ধর্মীয় বিদ্বান) | সর্বোচ্চ ধর্মীয় শিক্ষিত গোষ্ঠী। | তাদের ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা সবচেয়ে শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা। |
| আশরাফ (অভিজাত) | সমাজের প্রভাবশালী ও উচ্চবিত্ত সমাজ। | সামাজিক মর্যাদার কারণে আইনি সুরক্ষা বা বিশেষ সুবিধা পাবেন। |
| মধ্যবিত্ত | সাধারণ চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ী। | সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ার অধীন থাকবেন। |
| নিম্নবিত্ত | শ্রমিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী। | তাদের ওপর আইনের কঠোরতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কা। |
নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো স্বামী যদি ‘অতিরিক্ত মাত্রার শক্তি’ ব্যবহার করে স্ত্রীর হাড় ভেঙে ফেলেন বা দৃশ্যমান বড় জখম তৈরি করেন, তবেই তার সর্বোচ্চ ১৫ দিনের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এই দণ্ড কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। কারণ, একজন নির্যাতিত নারীকে আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তার ওপর নির্যাতন হয়েছে। এই প্রমাণের প্রক্রিয়ায় আরও কিছু কঠিন শর্তারোপ করা হয়েছে:
পুরুষের উপস্থিতি: নির্যাতিত নারী যখন আদালতে জখম দেখাতে যাবেন, তখন তার সাথে তার স্বামী (যিনি নির্যাতনকারী) অথবা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অভিভাবককে অবশ্যই থাকতে হবে।
হিজাব ও পর্দা: নারী কেবল হিজাব পরিহিত অবস্থায় তার জখম বিচারককে দেখাতে পারবেন, যা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক বিচারিক পর্যবেক্ষণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা: কোনো বিবাহিত নারী যদি তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান, তবে ওই নারীর সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই দণ্ডবিধিতে আরও একটি মধ্যযুগীয় দিক লক্ষ্য করা গেছে, তা হলো ‘মুক্ত’ মানুষ এবং ‘দাস’ মানুষের মধ্যে পার্থক্যের বিধান। অপরাধী যদি দাস শ্রেণির হয়, তবে তার শাস্তির মাত্রা মুক্ত মানুষের চেয়ে ভিন্ন হবে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে দাসপ্রথা বিলুপ্ত, সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় আইনে দাসের উল্লেখ থাকা বিশ্ব বিবেককে স্তম্ভিত করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই আইনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে আফগানিস্তান কয়েক দশক পিছিয়ে গেল। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছিল, এই নতুন ফৌজদারি আইন সেই নিপীড়নের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সত্ত্বেও তালেবান তাদের এই কঠোর শরিয়া ভিত্তিক আইনি ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছে।