খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৬ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিখর গ্রামে এক পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় এখনো মানুষের ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন, নানা কথা বলছেন।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য, মিনারুল ইসলাম অভাব-অনটনে জর্জরিত ছিলেন, তবু কাউকে কিছু বলতেন না। তাঁর স্ত্রীও কারও কাছে হাত পাততে চাইতেন না। সন্তানরাও সেই ভাবেই বড় হচ্ছিল। পরিবার থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন মিনারুল; বাবা-মা কিংবা ভাইদের সঙ্গেও খুব একটা মেলামেশা করতেন না।
শনিবার সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টা ওই এলাকায় অবস্থান করে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জানা যায়, মিনারুল সব কষ্ট চাপা রাখতেন। প্রতিবেশী মোক্তার হোসেন বলেন, ‘মিনারুল অভাব-অনটন, ধারদেনায় জর্জরিত ছিল। ঠিকমতো পেটে ভাত জুটত না। এ কারণে নিজের পথ নিজে বাইছা নিছে। এই কথাগুলো কাউকেই বলেনি—নিজের মা-বাবা, ভাই, বউ বা প্রতিবেশীকেও না। কুনুদিন প্রকাশ করেনি। না খেয়ে দিনের পর দিন রাস্তায় ঘুরেছে।’
মিনারুলের চাচা আবু তালেব বলেন, ‘ঋণের খবর বাবা বুলতি পারব না। অভাব ছিল, কিন্তু বুঝতে পারিনি। কাউকে বুলত না যে বাবা। ও যে এই ঘটনা ঘটাবে, এটা আমরা জানতাম না। এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।’
প্রতিবেশী আলাল উদ্দিন জানান, তিন দিন আগে মিনারুল তাঁর কাছে এসে টাকা ধার করার চেষ্টা করেছিলেন। ‘মিনারুল বুলল, “কাকা, টেকা ধার কোথাও পাওয়া যাবে কি না।” আমি বুললাম, “লাভ সুদে কেউ টেকা দিবে না, জমি বা পুকুর বন্দক লিয়ে দিবে।” পরে আর কথা হয়নি। শুনেছি বাবার কাছেও নাকি টেকা চেয়েছিল।’
আজ সকালেও মিনারুলের বাড়িতে ভিড় ছিল। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে ভ্যানে বা হেঁটে অনেকে আসছেন ঘটনাস্থল দেখতে। পবার হাট গোদাগাড়ী এলাকা থেকে আসা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘গতকাল আসতি পারিনি। আজ দেখতি আইলাম। এমন ঘটনা জীবনে শুনি নাই। ঋণ আর অভাবের কারণে কেউ কি নিজের বাচ্চা, স্ত্রীকে মারবি! আমরা খুব অবাক হয়িছি।’

মিনারুলের ছোট বোন নাজমা খাতুন ও মা আঞ্জুয়ারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। মিনারুলের মা বলেন, ‘আমার ছেলেটা এত চাপা ছিল যে কিছুই বুলে গেল না। আমার ছেলের রেনের টেকা ছিল জানতাম না। বুলে যায়নি।’ নাজমা বলেন, ‘আমার ভাই ছোটকাল থাইক্যেই কম কথা কইত্ত। আমাদের অভাব-অনটনের কথা কুনুদিনই কয়নি। এনজিও থাইক্যে হয়তো রেন করেছিল। তাও কোন এনজিও, সেইটা জানি না।’
গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজ ঘর থেকে মিনারুল ইসলাম (৩৫), তাঁর স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮), ছেলে মাহিন (১৩) এবং মেয়ে মিথিলা (২)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাহিন স্থানীয় খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। কৃষিকাজ করতেন মিনারুল।
লাশের পাশে উদ্ধার করা একটি দুই পৃষ্ঠার চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।’
পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা—অভাবের কারণে মিনারুল স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন।
এই ঘটনায় শুক্রবার রাতে নগরের মতিহার থানায় দুটি মামলা হয়। মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী অপমৃত্যুর মামলা করেন এবং শাশুড়ি শিউলি বেগম হত্যা মামলা করেন।
আজ বাড়ির পাশে চারজনের কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি থাকলেও মিনারুলের শাশুড়ি মেয়ে ও নাতনির মরদেহ নিজ বাড়িতে নিতে চান। পরে মিনারুল ও তাঁর ছেলে মাহিনকে গ্রামে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়।
খবরওয়ালা/এন