খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে মাঘ ১৪৩২ | ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বৈরি স্রোতের বিপরীতে সাতাঁর কেটে সাফল্যের তীরে পৌঁছানো এক কলমযোদ্ধার নাম পীর হাবিবুর রহমান। আমাদের বন্ধুত্বের প্রথম দিন থেকেই আমরা একে অপরকে হৃদয়ের গভীর থেকে ডাকতাম— দোস্ত। এই এক শব্দেই ধরা থাকত বিশ্বাস, ভরসা, আবেগ আর নির্ভীক সহযাত্রা।
অপ্রিয় সত্য বলার সাহস, তথ্যনির্ভর যুক্তি, ছান্দিক গতি আর সাবলীল ভাষা—সব মিলিয়ে পীর হাবিবের লেখালেখির ছিল নিজস্ব এক স্বাক্ষর। সংবাদ, কলাম, গদ্য, সাহিত্য—লেখার প্রায় সব শাখাতেই তার রুচি ও রসবোধ ছিল অনায়াস। শব্দ নিয়ে খেলতে জানত সে; তার হাতে শব্দ বাজত ঘুঙুরের মতো—ঝংকার তুলে, মন কাঁপিয়ে।

হিসেবের খাতা বাইরে রেখে দেশ, মানুষ আর উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সে আমৃত্যু কলম চালিয়েছে। সাদা-কালোকে আলাদা করে চিনতে তার কখনো দ্বিধা হয়নি। ভনিতা ছাড়াই, রাখঢাক না করে, নিজের বিশ্বাসকে সোজাসাপ্টা ভাষায় লিখে গেছে নিরন্তর। হঠাৎ রেগে যেত, হঠাৎ আবেগে ভাসত—তবু বিশ্বাসের জায়গায় ছিল অটল। তার লেখায় ছিল সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষরণ, অতৃপ্তি, দহন আর দ্রোহ—যা সে নিজেও আমৃত্যু বহন করেছে।

রোমান্টিক প্রেমিক হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথ। সত্যের পক্ষে বিদ্রোহে জ্বলে উঠত নজরুল। হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে থাকত লালন। সে বিশ্বাস করত—মনের ক্ষত আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ছাড়া কবি হওয়া যায় না, লেখক হওয়া যায় না, সাংবাদিকও হওয়া যায় না। সেই মনই তাকে বারবার টেনে নিত তার প্রথম প্রেমের শহরে—জল-জোছনার শহর সুনামগঞ্জে।
হাওড়, জল, জোছনা আর গানঘেরা সেই মফস্বল শহরেই ১৯৬৩ সালের ১২ নভেম্বর জন্ম নেয় আমার দোস্ত। বাবা মরহুম রইস আলী পীর ও মা সৈয়দা রহিমা খানমের সপ্তম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে, দুরন্ত, পাড়া আর স্কুল মাতানো এক দস্যি ছেলে। কৈশোরেই ছাত্রলীগের মিছিলে হাঁটতে শুরু।

সুনামগঞ্জ সরকারি জুবলী স্কুল থেকে এসএসসি, সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকেই অনার্স ও এমএসএস। ’৮৪ সাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে ’৮৫ সালে কারাবরণও করেছে।
আমরা দু’জন পাশাপাশি হলে থাকতাম—সে এস এম হলে, আমি সৈয়দ আমির আলী হলে। ভিন্ন সংগঠন করলেও বন্ধুত্বে কোনো ফাঁক পড়েনি। গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাস ঘোরা, ভিসিআরে হিন্দি-বাংলা সিনেমা—সবই ছিল আমাদের যৌবনের নিত্যদিন।
রাকসু নির্বাচনে আমরা দু’জনই পত্রিকা সম্পাদক পদে, দুই প্যানেল থেকে লড়েছি। আমি জিতেছি, সে হারিয়েছে। কিন্তু সম্পর্ক? একটুও আঁচ লাগেনি। বরং আমাকে বুকে জড়িয়ে বলে উঠেছিল,
“তুই উঠা মানে তো আমিই উঠা।”
এই ছিল আমার দোস্ত পীর হাবিব।


’৯১ সালে ঢাকায় এসে পুরোপুরি সাংবাদিকতায় নিজেকে ঢেলে দেয়। বাংলাবাজার, যুগান্তর হয়ে ‘আমাদের সময়’-এ তার প্রথাভাঙা কলামগুলো তৈরি করে তুমুল আলোড়ন। এরপর মৃত্যুঅবধি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দুই হাত খুলে লিখে গেছে। পাশাপাশি লিখেছে উপন্যাস, গল্প, করেছে টিভি টকশো—অস্থির বাস্তবতার মাঝেও থামেনি সৃজন।
১৯৯৩ সালে মগবাজার কাজী অফিসে ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুর কন্যা ডায়না নাজরীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। দুই সন্তান—পুত্র আহনাফ ফাহমিন অন্তর ও কন্যা রাইসা নাজ চন্দ্রস্মিতা।
পূর্ণিমার রাতে হাওড়ের নৌকাবিহার, জোছনায় শরীর ধোয়া, বৃষ্টিতে ভিজে ফেরা—প্রকৃতি আর সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে থাকার মধ্যেই সে খুঁজে পেত জীবন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলতে হলে তার শরীর অবশ হয়ে আসত, চোখেমুখে নামত বিষণ্নতা। বৈরি স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে অর্ধেকের বেশি জীবন পার করেও মাথা নত করেনি সে কখনো।


করোনাকালের শুরুতে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা, কেমো, বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট—সবই মোকাবিলা করেছে মানসিক শক্তিতে। ক্যানসারকে জয় করেছিল, কিন্তু করোনাকে আর পারেনি। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল শূন্যের কোঠায়।
২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৮ মিনিটে লাইফ সাপোর্ট খুলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা আসে—পীর হাবিব নেই।
কিন্তু সে চলে যায়নি।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ প্রতিদিন কার্যালয়, সিলেট ও সুনামগঞ্জ—যেখানেই তার কফিন গেছে, সেখানেই ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে এক জীবনের সম্মান। ছয়টি জানাজা শেষে বাবা-মায়ের কবরের পাশে, তার শেষ ইচ্ছামতো, চিরনিদ্রায় শুয়ে পড়েছে আমার দোস্ত।
সেদিন শেষ হয়েছিল পীর হাবিব নামের এক বর্ণাঢ্য জীবন-উপাখ্যান।
কিন্তু স্মৃতি, লেখা, বিশ্বাস আর সাহস—সেগুলো এখনো জীবিত।
তাই আজও বলি—
হে দোস্ত, ওপারে ভালো থাকিস তোর মত করেই।
তোর সন্তান, স্ত্রী, পরিবার, বন্ধু আর লক্ষ কোটি পাঠক—আমরা সবাই হাজার স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছি, বেদনায় নীল হয়ে।
লেখকঃ এ বি এম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক – প্রকাশক, খবরওয়ালা ও প্রায়ত সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান এর বন্ধু যোহযোদ্ধা, সহকর্মী