এ বি এম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 22শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৬ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার ৭১ বছর পূর্ণ করে ৭২ বছরে পা রাখলো। আমার জীবনের গর্ব, অহংকার ও আত্মপরিচয়ের শেকড় গাঁথা এই প্রিয় বিদ্যাপীঠে।
এখানেই আমার শিক্ষা, আমার রাজনীতি, আমার আন্দোলন-সংগ্রাম—সবকিছুর শুভ সূচনা। আমি যা কিছু অর্জন করেছি, যা কিছু সম্মান বা দায়িত্ব পেয়েছি, তার সিংহভাগই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অফুরন্ত অনুপ্রেরণা থেকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরপর দু’বার আমাকে নির্বাচিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে। আজীবনের জন্য এই বিশ্বাস ও ভালোবাসার কাছে আমি ঋণী। এখনও প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় মতিহার চত্বরে পা রাখলে হৃদয়ের গভীর থেকে আবেগ জেগে ওঠে- স্মৃতি, প্রেম, সংগ্রাম আর স্বপ্নের সম্মিলিত এক অনুভূতিতে।
এই গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস আমরা যেন ভুলে না যাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন গর্ব করে এই নাম উচ্চারণ করতে পারে-এই উদ্দেশ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরছি:
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
ব্রিটিশ আমল, ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হয়। এক সময় এখানে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ও আইন বিভাগ চালু হলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হতে থাকে, তখন রাজশাহীতে নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ক্রমে জোরালো হয়।
ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হয় গণআন্দোলন। ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর গঠিত হয় ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজে ছাত্রদের জোরালো আন্দোলন এবং ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারির দুইটি জনসভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও তীব্র করে তোলে।
জনতার দাবিতে আন্দোলনরত ১৫ ছাত্রনেতা কারারুদ্ধ হন। জনমতের চাপে সরকার সাড়া দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। ৬ জুলাই প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শুরু হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা।
মতিহারে গড়ে ওঠে গৌরবময় চত্বরে
প্রথমদিকে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণেই শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। ধীরে ধীরে পদ্মার তীরবর্তী বড়কুঠি, লালকুঠি, ফুলার হোস্টেলসহ শহরের বিভিন্ন অংশে গড়ে ওঠে প্রশাসনিক ভবন, হোস্টেল ও শ্রেণিকক্ষ। পরবর্তীতে অস্ট্রেলীয় স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের নকশায় গড়ে ওঠে বর্তমান মতিহার ক্যাম্পাস, যেখানে ১৯৬৪ সাল নাগাদ স্থানান্তরিত হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: সংগ্রামের এক নাম
স্বাধীনতা-পূর্ব স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. শামসুজ্জোহা। ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন তিনি। তাঁর রক্তের ধারা আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী। শহীদ অধ্যাপক হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ুম, ছাত্রনেতা ও কর্মীরা আজও আমাদের গৌরবের অংশ।
এছাড়া ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হন মেধাবী ছাত্রনেতা ও তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ শাজাহান সিরাজ। শহীদ হন হকার আব্দুল আজিজ। গুলিবিদ্ধ হন রাকসু’র সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভী।
সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ইয়াসির আহমেদ পিটু, রিমু আহত ও পঙ্গু হন আরও অনেকে।
আমাদের প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতা
এই গৌরবময় ইতিহাস শুধু গর্বের নয়, দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতারও। আমরা চাই, লুটপাট, দলবাজি ও অপসংস্কৃতি বর্জন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হোক শিক্ষা ও গবেষণার মানদণ্ড। হোক সমগ্র দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই এবং প্রশাসন সবাই মিলে এই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
আমরা অত্যন্ত দুঃখিত যে, বিভিন্ন বাস্তব কারণে এখন পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এর নির্বাচন ও কার্যকর কমিটি গঠন করতে আমরা পারেনি। তবে আমার বিশ্বাস, খুব দ্রুতই কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে। যে কোনো অবস্থায় সব সময় মন থেকে আমরা সবাই আজ একসঙ্গে আছি, গর্বে-ভালোবাসায়-সন্মানে।
আমার প্রান প্রিয় রা বি’র ৭২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমার প্রত্যাশা আগামী ১০০ তম বার্ষিকীতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মাঝে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিক।
লেখক:
এ বি এম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক “খবরওয়ালা”
সাংগঠনিক সম্পাদক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা চ্যাপ্টার
সাবেক পত্রিকা সম্পাদক, রাকসু।