খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আঁচ এখন বাংলাদেশের জলসীমায় নিয়মিত মৎস্যজীবীদের জীবনের ওপর আছড়ে পড়ছে। গত পাঁচ মাসে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অন্তত ৪২০ জন জেলেকে বাংলাদেশের সীমানা থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও অপহৃতদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে নেই কোনো সরকারি তথ্য। বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের উদ্ধারে সরকারের কাছে আর্তনাদ ও তীব্র আকুতি জানিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সেন্ট মার্টিন থেকে আগত হুমায়রা বেগম ও রাবেয়া বেগম তাদের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন। হুমায়রার স্বামী গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে নিখোঁজ। অশ্রুভেজা চোখে তিনি বলেন, “স্বামী বেঁচে আছেন না কি মারা গেছেন তা জানি না। দুই সন্তান নিয়ে আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে। তার ওপর মৎস্য শিকারের জন্য নেওয়া দাদনের ঋণের চাপ বাড়ছে প্রতিদিন।” একইভাবে রাবেয়া বেগম ও তাদের শাশুড়ি মদিনা বেগম সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলেন, নিজ দেশের সীমানায় মাছ ধরাও এখন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। মদিনা বেগমের আকুল আবেদন—মৃত্যুর আগে যেন তিনি তার অপহৃত দুই ছেলের মুখ দেখে যেতে পারেন।
নিচে সেন্ট মার্টিনের বর্তমান সংকট ও অপহরণের একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
সারণি: সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ উপকূলের জেলে অপহরণ চিত্র
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাদি |
| মোট নিখোঁজ জেলের সংখ্যা | ৪২০ জন (আনুমানিক) |
| অপহরণের সময়কাল | গত ৫ মাস ধরে ধারাবাহিক |
| অপহরণকারী গোষ্ঠী | আরাকান আর্মি (মিয়ানমার) |
| প্রধান মৎস্য এলাকা | সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ সংলগ্ন নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর |
| আর্থ-সামাজিক প্রভাব | তীব্র খাদ্য সংকট ও দাদনের ঋণের বোঝা |
অনুষ্ঠানে বক্তারা সেন্ট মার্টিনের জেলেদের নিরাপত্তাহীনতাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিএসএফের হাতে কোনো বাংলাদেশি আক্রান্ত হলে যে পরিমাণ প্রতিবাদ হয়, আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে সরকার ও ছাত্র সমাজ সেভাবে সোচ্চার নয়। তার মতে, একটি প্যারামিলিটারি বাহিনীর কাছে দেশের কয়েকশ নাগরিক জিম্মি থাকা সত্ত্বেও সুরাহা করতে না পারা সরকারের চরম দুর্বলতার পরিচয়।
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, “সমুদ্র বিজয় হলেও সমুদ্রে বাংলাদেশের জেলেদের নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি।” তিনি মনে করেন, সেন্ট মার্টিনকে কেবল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখলে হবে না, বরং এর অধিবাসীদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, রাষ্ট্র নিখোঁজদের পরিবারকে ন্যূনতম স্বান্তনা দেওয়ার মতো তথ্যও দিতে পারছে না।
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস মৎস্য শিকার। কিন্তু বর্তমানে নাফ নদী ও গভীর সমুদ্রে আরাকান আর্মির আধিপত্য ও নিয়মিত অপহরণের ঘটনায় দ্বীপের অর্থনীতি ধসে পড়ছে। পর্যটন মৌসুম সীমিত হওয়ায় জেলেরা এখন দিশেহারা। অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি কিংবা রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে সাধারণ জেলেদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা ও নৌ-বাহিনীর টহল জোরদার করার মাধ্যমে এই ৪২০ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন দ্বীপবাসী।