খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৪ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করলেও, এবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রত্যক্ষ সমর্থন ও চাপের মুখে ইরানের ‘এসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ তাকে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য নির্বাচিত করে।
মোজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে বড় হওয়া মোজতবা ১৯৮৭ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগদান করেন। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের রণাঙ্গনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যা তাকে সামরিক মহলে শক্তিশালী ভিত্তি এনে দেয়। যুদ্ধের পর নব্বইয়ের দশকে তিনি কোমের বিখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সেমিনারিতে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
বাবার দপ্তরে কাজ করার সুবাদে মোজতবা গত দুই দশকে নিজেকে ইরানের প্রকৃত ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং বিশেষ করে আইআরজিসির ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। ২০০৫ ও ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয়ের নেপথ্যে তার বিশাল ভূমিকা ছিল বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করেন।
| বৈশিষ্ট্য | তথ্যাদি |
| জন্ম | ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯, মাশহাদ, ইরান। |
| সামরিক পরিচয় | আইআরজিসি সদস্য ও ইরান-ইরাক যুদ্ধজয়ী। |
| ধর্মীয় উপাধি | আয়াতুল্লাহ (২০২২ সালে ভূষিত)। |
| পূর্বতন দায়িত্ব | অফিস অব দ্য সুপ্রিম লিডারের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক। |
| রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা | ২০০৯ ও ২০২২ সালের বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা। |
| বর্তমান পদবি | ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার)। |
মোজতবা খামেনির ক্ষমতা আরোহণ কেবল নিয়মমাফিক নয়, বরং এটি নানা বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন বিক্ষোভ দমনে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের নির্দেশ সরাসরি তার দফতর থেকেই আসত বলে ধারণা করা হয়।
একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে প্রয়োজনীয় উচ্চতর পাণ্ডিত্য না থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিশ্লেষকরা তখন থেকেই ধারণা করছিলেন যে, এটি ছিল তাকে সর্বোচ্চ নেতার পদে বসানোর একটি প্রাথমিক ধাপ। বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের এই ধারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এমন এক সন্ধিক্ষণে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত। বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে এখন তাকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি ইরানকে কতটা স্থিতিশীল রাখতে পারেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়। সামরিক বাহিনীর পূর্ণ সমর্থন থাকলেও সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জনই হবে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।