খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহার পরপরই দেশের সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবার বিদ্যুতের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নতুন এই নির্ধারিত ট্যারিফ চলতি জুন মাস থেকেই দেশব্যাপী কার্যকর করা হবে।
তবে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত ‘লাইফ লাইন’ ক্যাটাগরিতে আপাতত কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। এর ফলে পূর্বের নিয়ম অনুসারেই শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকগণ বর্তমানের বিদ্যমান আর্থিক সুবিধা ও ট্যারিফ রেট যথারীতি বহাল পাবেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ঈদের ছুটির আগেই বিদ্যুতের এই মূল্য সমন্বয় সংক্রান্ত যাবতীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন কেবল কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া বাকি রয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল থেকেই নতুন এই বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের করা ঋণচুক্তির শর্তের অংশ হিসেবেই মূলত বিদ্যুতের দাম পুনরায় সমন্বয়ের এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দুই মাস পূর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বনিম্ন ১ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করেছে। এর পাশাপাশি প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে বিইআরসির আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করার পরামর্শও দিয়েছে এই কমিটি।
বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবসমূহ মূল্যায়নের লক্ষ্যে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী একটি সর্বজনীন গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। উক্ত গণশুনানিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বনিম্ন ৮৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি করার জন্য নিজ নিজ যুক্তি ও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করে।
কোম্পানিগুলোর দাখিলকৃত প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন জানায়।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিইআরসির কারিগরি কমিটি সার্বিক হিসাব-নিকাশ যাচাই করে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেয়। কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছে যে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কমিশন শেষ পর্যন্ত কারিগরি কমিটির এই সুপারিশটিকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
বিইআরসির একজন কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গণশুনানিতে আসা সব পক্ষের মতামত ও যুক্তি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই ইউনিটপ্রতি মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ১ টাকার কম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম হারে দাম বাড়ানো হবে। এরপর ২০০ থেকে ৪০০ ইউনিট এবং ৪০০ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ধাপে ধাপে উচ্চ মূল্যের ট্যারিফ নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়বে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী উচ্চবিত্ত বা বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ওপর।
দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পক্ষ থেকে উত্থাপিত ইউনিটপ্রতি মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং বিইআরসির কারিগরি কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের তুলনামূলক চিত্রটি নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নাম | কোম্পানির প্রস্তাবিত মূল্য বৃদ্ধি (প্রতি ইউনিট) | বিইআরসির কারিগরি কমিটির সুপারিশ (গড়ে) |
| বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) | ০.৮৫ টাকা (৮৫ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |
| পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) | ১.৭৭ টাকা (১ টাকা ৭৭ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |
| ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) | ১.৫৪ টাকা (১ টাকা ৫৪ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |
| ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) | ১.৯৮ টাকা (১ টাকা ৯৮ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |
| ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) | ১.৩৯ টাকা (১ টাকা ৩৯ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |
| নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) | ২.০৫ টাকা (২ টাকা ০৫ পয়সা) | ১.২৫ টাকা (১ টাকা ২৫ পয়সা) |