ঈদপূর্ব অবলুপ্তির পথে সংকটে থাকা ছয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান

দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত ছয়টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (NBFI) স্থায়ীভাবে বন্ধ বা অবলুপ্ত (Liquidation) করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল ছাড় সাপেক্ষে আগামী পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তহবিল প্রাপ্তি ও অবলুপ্তির প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ এবং অবলুপ্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অর্থ বিভাগের কাছে ৫,৬০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ এই অর্থ দুই কিস্তিতে প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। প্রথম কিস্তিতে ২,৬০০ কোটি টাকা পাওয়া গেলে অবিলম্বে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। প্রশাসকদের মূল দায়িত্ব হবে সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া। ব্যক্তিগত আমানতকারীদের দাবি নিষ্পত্তির পর আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবলুপ্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সচল রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫,৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১,৪৬২ কোটি টাকা বা ৮৩.১৬ শতাংশই খেলাপি। এর বিপরীতে বন্ধকী সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৬,৮৯৯ কোটি টাকা, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, সুস্থ ধারায় থাকা বাকি ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭.৩১ শতাংশ।

নিচে অবলুপ্তির তালিকায় থাকা ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হলো:

প্রতিষ্ঠানের নাম খেলাপি ঋণের হার (%) জমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ (কোটি টাকা)
এফএএস (FAS) ফিন্যান্স ৯৯.৯৩% ১,৭১৯
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ৯৬% ৪,২১৯
পিপলস লিজিং ৯৫% ৪,৬২৮
ফারইস্ট ফিন্যান্স ৯৮% ১,০১৭
আভিভা ফিন্যান্স ৮৩% ৩,৮০৩
প্রিমিয়ার লিজিং ৭৫% ৯৪১

পর্যবেক্ষণে থাকা তিনটি প্রতিষ্ঠান

গত ২৭ জানুয়ারির বোর্ড সভায় ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অবলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিলেও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের অবস্থা উন্নয়নের জন্য ৩ থেকে ৬ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (BIFC), জিএসপি ফিন্যান্স এবং প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারে এবং মূলধন বাড়াতে সক্ষম হয়, তবে তাদের অবলুপ্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

আমানতকারী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা

বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে। বিশেষ করে সাধারণ বিনিয়োগকারী বা ব্যক্তিগত আমানতকারীদের পাওনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ করা হবে। বর্তমানে সংকটাপন্ন ২০টি প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪,৯৭১ কোটি টাকা। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদ্যমান চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী তাদের সকল সুযোগ-সুবিধা ও পাওনা বুঝে পাবেন।

এই সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়। বছরের পর বছর ধরে চলা লুটপাট ও অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।