খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর কদমতলী থানা এলাকায় সাত বছরের শিশু রিফাত হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা পাওয়া গেছে। মুঠোফোন চুরির অপবাদ ও তুচ্ছ পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিবেশী এক নারীর নৃশংসতার বলি হয়েছে ফুটফুটে এই শিশুটি। ঘাতক নারী মায়া বেগম ওরফে লাবণী শিশুটিকে হত্যার পর অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মরদেহটি একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে গুম করার চেষ্টা চালান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; পুলিশের নিপুণ তদন্ত ও একটি সাধারণ কামিজের সূত্র ধরে উন্মোচিত হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
নিহত শিশু রিফাতের বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। গত মঙ্গলবার বিকেলে রিফাত বাসার সামনে খেলা করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে তার মা মুন্নি আক্তার কদমতলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করলেও প্রথম দিকে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না। বুধবার রাতে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মুন্নি আক্তার গেন্ডারিয়া থানায় গিয়ে সেটি তার নিখোঁজ সন্তান রিফাতের বলে শনাক্ত করেন।
কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করে। মরদেহের সাথে একটি কামিজ পাওয়া যায়, যা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তদন্তকারী দল কামিজটি স্থানীয় বাসিন্দাদের দেখালে রিফাতের বোন সেটি চিনে ফেলে। সে জানায়, এই ধরনের পোশাক তাদের প্রতিবেশী মায়া বেগমের মেয়ের। পুলিশ দ্রুত মায়া বেগমের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালায় এবং তার মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মেয়েটি পোশাকটি নিজের বলে দাবি করলেও সেটি দেখাতে ব্যর্থ হয়। এতে পুলিশের সন্দেহ দৃঢ় হয় এবং মায়া বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে মায়া বেগম স্বীকার করেন যে, কয়েক মাস আগে তার একটি মুঠোফোন চুরি হয়। এই চুরির জন্য তিনি রিফাতের পরিবারকে সন্দেহ করতেন, যা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের তিক্ততা ছিল। মঙ্গলবার রিফাতকে একা পেয়ে তিনি খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যান। সেখানে চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে রিফাতকে জোরে থাপ্পড় মারলে তার মাথা খাটের সাথে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
নিচে ঘটনার ধারাবাহিকতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য সারণিবদ্ধ করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| ভিকটিম | রিফাত (৭ বছর), পিতা: জাহাঙ্গীর হোসেন। |
| অভিযুক্ত | মায়া বেগম ওরফে লাবণী (স্কুল দপ্তরি)। |
| হত্যার কারণ | মুঠোফোন চুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ। |
| মরদেহ গুমের পদ্ধতি | প্লাস্টিকের চালের ড্রামে ভরে গেন্ডারিয়ার ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া। |
| তদন্তের মূল সূত্র | লাশের সাথে পাওয়া একটি কামিজ ও সিসিটিভি ফুটেজ। |
| বর্তমান অবস্থা | অভিযুক্ত মায়া বেগম গ্রেপ্তার ও হত্যার কথা স্বীকার। |
পুলিশের ভাষ্যমতে, মায়া বেগম পেশায় স্থানীয় একটি স্কুলের দপ্তরি। হত্যার পর তিনি সারা রাত লাশের ড্রামটি পাহারা দেন এবং পরদিন অটোরিকশায় করে গেন্ডারিয়ার লোহারপুল এলাকায় ড্রামটি ফেলে আসেন। এই ঘটনায় কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তুচ্ছ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন প্রতিবেশী নারীর এমন নৃশংস আচরণ সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শিশু সুরক্ষায় পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।