বিশ্বব্যাপী কার্গো বিমা বাজার এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে ঝুঁকির প্রকৃতিও আমূল বদলে গেছে। এক সময় কার্গো ঝুঁকি বলতে মূলত সশস্ত্র ডাকাতি, গুদামে চুরি কিংবা পরিবহনের পথে পণ্য লুটের মতো শারীরিক হুমকিকেই বোঝানো হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র বদলে গিয়ে শারীরিক অপরাধের পাশাপাশি ডিজিটাল জালিয়াতি ও পরিচয় প্রতারণা সমানভাবে বড় ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্ডাররাইটিং নীতি পুনর্বিবেচনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন কাঠামো নতুনভাবে সাজানো এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিমা সংস্থা ও পরিবহন সম্পদ সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, কার্গো অপরাধ এখন আর শুধু ট্রাক ছিনতাই বা বন্দরকেন্দ্রিক চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংগঠিত অপরাধী চক্র ডিজিটাল ফ্রেইট প্ল্যাটফর্ম, দুর্বল পরিচয় যাচাই পদ্ধতি এবং স্বয়ংক্রিয় অনলাইন বুকিং ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বৈধ সরবরাহ শৃঙ্খলে অনুপ্রবেশ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমা দাবির সংখ্যা ও প্রতিটি দাবির আর্থিক অঙ্কে, যা বিমা কোম্পানির ক্ষতির তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে বিশ্বের ১২৯টি দেশে প্রায় এক লাখ ষাট হাজার কার্গো-সম্পর্কিত অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার ফলে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কার্গো বিমা খাত সামুদ্রিক বিমা শিল্পের সবচেয়ে ক্ষতিপ্রবণ অংশগুলোর একটি হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের প্রভাব বিমাকারীদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২২–২০২৪ সময়ে বৈশ্বিক কার্গো অপরাধের সারসংক্ষেপ
সূচক | তথ্য
দেশের সংখ্যা | ১২৯
নথিভুক্ত ঘটনা | প্রায় ১,৬০,০০০
আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি | কয়েক বিলিয়ন ইউরো
উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল | লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার কিছু অংশ
প্রধান ক্ষতির কারণ | চুরি, জালিয়াতি, পরিচয় প্রতারণা
বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভুয়া পরিবহন প্রতিষ্ঠানের উত্থান। অপরাধী চক্রগুলো ভুয়া ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি তৈরি করছে, বৈধ পরিবহনকারীর ডিজিটাল পরিচয় ও নথিপত্র নকল করছে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কার্গো সংগ্রহ করছে। শারীরিক চুরি ও ডিজিটাল প্রতারণার এই সংমিশ্রণ প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও ক্ষতি পুনরুদ্ধারকে অত্যন্ত জটিল করে তুলছে।
একই সঙ্গে বিমা সনদ জাল করা, ভুয়া ইমেইল ডোমেইন ও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে তৈরি ওয়েবসাইটের ব্যবহারও বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে জাল নথি ও যোগাযোগ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে, যা প্রতারণার পরিসর ও গতি উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্ডাররাইটারদের জন্য এর প্রভাব কেবল ক্ষতিপূরণ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভুয়া পরিবহনকারী যাচাই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে, সাবরোগেশন কার্যক্রম বিলম্বিত করে এবং সীমান্ত-পেরোনো আইনি বিরোধের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে এখন কার্গো ঝুঁকি আর শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে না; বরং ডিজিটাল পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রকৃত অপারেটর শনাক্ত করার সক্ষমতাই ভবিষ্যতে কার্গো বিমা খাতের স্থিতিশীলতা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।