খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 9শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো শহর। গত বুধবার বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপাড়ে ঘুরতে গিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ বা নবীন ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া নুরুল্লাহ শাওনের (২৬) মরদেহ দুই দিন পর নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাত পৌনে ১১টার দিকে নগরীর জয়নুল আবেদিন উদ্যান সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদে মরদেহটি ভেসে ওঠে।
নিহত নুরুল্লাহ শাওন আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার চর জাকালিয়া গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের সন্তান। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার বিকেলে শাওন তার বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান রিয়াদের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপাড়ে বেড়াতে যান। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে প্রায় সাত সদস্যের একটি কিশোর অপরাধী দল তাঁদের ঘিরে ধরে। তারা অস্ত্রের মুখে সঙ্গে থাকা টাকাপয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী দাবি করে।
শাওন ও রিয়াদ জানান যে, তাঁদের কাছে নৌকা ভাড়া ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কিশোর অপরাধীরা তাঁদের ওপর চড়াও হয় এবং বেদম মারধর শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে দুই বন্ধু প্রাণভয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। রিয়াদ সাঁতরে নদ পার হয়ে লোকালয়ে ফিরতে সক্ষম হলেও শাওন চারজন আক্রমণকারীর ধাওয়ার মুখে নিখোঁজ হন।
ঘটনার পর রিয়াদ স্থানীয়দের সহায়তায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর অপরাধীকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। বৃহস্পতিবার সকালে নদের পাড়ে শাওনের ব্যাগ ও জুতা পাওয়া গেলেও ডুবুরি দল দিনভর চেষ্টা চালিয়ে তাঁর সন্ধান পায়নি। অবশেষে শুক্রবার রাতে মাঝিরা মরদেহটি ভাসতে দেখে ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে।
ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| নিহতের নাম | নুরুল্লাহ শাওন (২৬) |
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠান | আনন্দ মোহন কলেজ (রসায়ন বিভাগ, ৩য় বর্ষ) |
| ঘটনার সময় | বুধবার সন্ধ্যা ৬টা (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) |
| ঘটনাস্থল | ব্রহ্মপুত্র নদের চর এলাকা (জয়নুল আবেদিন উদ্যান সংলগ্ন) |
| আসামিদের ধরণ | কিশোর ছিনতাইকারী দল (বয়স ১৩-১৬ বছর) |
| উদ্ধারকাল | শুক্রবার রাত ১০:৪৫ মিনিট (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) |
| আইনি পদক্ষেপ | কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ছিনতাই মামলা দায়ের |
শাওনের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে ভিড় জমান। তাঁদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। নিহতের বন্ধু শোয়াইব আক্তার অভিযোগ করেন, অভিযুক্তদের নাম-ঠিকানা পুলিশকে দেওয়া হলেও বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। তাঁরা দাবি করেন, কিশোর গ্যাং কালচারের কারণে আজ একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন অকালে ঝরে গেল।
শাওনের মা সাহিদা বেগম বাদী হয়ে ইতিমধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত এক কিশোরকে এই মামলায় অভিযুক্ত দেখানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব জানান, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এটি কেবল ছিনতাইয়ের ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান পরিচালনা করছে। জনাকীর্ণ পর্যটন এলাকায় এমন নৃশংস ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত শাওন ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র ভরসা। বাবার মৃত্যুর পর অনেক কষ্টে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি এখন নিদারুণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।