খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
বরগুনা সদর উপজেলায় ঝড়ের কবলে পুকুরে ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক নারী ও তাঁর দুই বছর বয়সী শিশু সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১০ জুন) বিকেলে বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের রায়ভোগ নামক এলাকার নিজ বাড়ির পুকুর থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনার পর স্থানীয় এলাকা এবং নিহতের পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ প্রচেষ্টায় পুকুর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ এবং নিহতের পারিবারিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতে বরগুনার বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে তীব্র ঝড়ো হাওয়াসহ ভারী বৃষ্টিপাত প্রবাহিত হয়। এই ঝড়ের তাণ্ডবে সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের রায়ভোগ এলাকার বাসিন্দা মো. মিরাজের বসতবাড়ির একটি বড় গাছ উপড়ে যায়। গাছটি ভেঙে পড়ার সময় পাশে থাকা পল্লী বিদ্যুতের মেইন লাইনের তার ছিঁড়ে সরাসরি মিরাজের বাড়ির পুকুরের পানির মধ্যে পড়ে নিমজ্জিত হয়ে থাকে।
রাতের অন্ধকারে এবং ঝড়-বৃষ্টির প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পুকুরে পড়ে থাকার বিষয়টি মিরাজের পরিবারের বা আশপাশের কোনো মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়নি। ফলে পুকুরের পানি সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়িত হয়ে ছিল। পরবর্তীতে বুধবার দুপুরের দিকে মো. মিরাজের স্ত্রী নুপুর আক্তার (২০) তাঁর দুই বছর বয়সী শিশু সন্তান শাহাদাতকে সাথে নিয়ে পারিবারিক কাজে ওই পুকুরঘাটে যান। নুপুর আক্তার যখন তাঁর সন্তানকে নিয়ে পুকুরের পানিতে নামেন, ঠিক তখনই পানির নিচে থাকা পল্লী বিদ্যুতের সচল ও উন্মুক্ত ছেঁড়া তারের সংস্পর্শে আসেন। ফলশ্রুতিতে মা ও ছেলে উভয়েই তাৎক্ষণিকভাবে তীব্রভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন এবং পুকুরের পানির মধ্যেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
পুকুরে মা ও ছেলের নিখোঁজ বা মৃত্যুর বিষয়টি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেননি। এরপর বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে বরগুনা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের লাইনম্যান ও টেকনিশিয়ানরা ওই এলাকায় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তার মেরামত করার উদ্দেশ্যে মো. মিরাজের বাড়ির সীমানায় আসেন। তারা যখন লাইনের কাজ করতে পুকুরপাড়ের দিকে যান, তখন পুকুরের পানির মধ্যে নুপুর আক্তার ও শিশু শাহাদাতের মরদেহ ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় থানা-পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে বরগুনা সদর থানা-পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দ্রুত রায়ভোগ এলাকার দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পুকুরে নেমে মা ও ছেলের মরদেহ পানি থেকে ওপরে তুলে আনেন।
নিহত নুপুর আক্তারের দেবর মো. সাইফুল এই বিষয়ে তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, “গতকাল রাতে প্রচণ্ড ঝড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে আমাদের পুকুরে পড়ে ছিল। আমি প্রতিদিনের মতো সকালে নিজের কাজে বাইরে চলে গিয়েছিলাম। দুপুরে কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে এসে দেখি আমার ভাইয়ের স্ত্রী এবং তাঁর ছোট ছেলে পুকুরে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। আমরা কেউ আগে থেকে টের পাইনি।”
নিহতদের আরেক স্বজন আব্দুল মন্নান বলেন, “ঝড়ে যে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পুকুরের পানিতে পড়ে ছিল, তা বাড়ির বা এলাকার কেউ জানতেন না। দুপুরে ছেলেকে নিয়ে নুপুর পুকুরে গোসল বা হাত-মুখ ধুতে গেলে তারা ওই তারের সংস্পর্শে এসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। বিকেলে বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন লাইনের ছেঁড়া তার ঠিক করতে এসে পুকুরে মরদেহ দুটি দেখতে পায়।”
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন বরগুনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম।
ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি এবং বর্তমান আইনি পদক্ষেপের খতিয়ান নিচে উল্লেখ করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা |
| নিহতদের পরিচয় | নুপুর আক্তার (মো. মিরাজের স্ত্রী) এবং শাহাদাত (বয়স ২ বছর)। |
| মরদেহ উদ্ধার | খবর পেয়ে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল বিকেল ৩টার পর ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। |
| বর্তমান আইনি অবস্থা | সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। |
বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পুলিশ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করেছে। বিদ্যুতের তারটি ঝড়ে ছিঁড়ে পড়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।