খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার পাঁচদিন পর শহিদুল মাতুব্বর নামের এক অটোরিকশাচালকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে মুকসুদপুর থানা পুলিশ। অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালককে হত্যা করে মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। বুধবার (১০ জুন) বিকালে পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার পান্থাপাড়া এলাকার একটি নির্জন রাস্তার পাশের ঝোপের ভেতর থেকে এই মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ দুই যুবককে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতেই এই মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
নিহত শহিদুল মাতুব্বর মুকসুদপুর উপজেলার কমলাপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল ছালাম মাতুব্বরের ছেলে। তিনি পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক ছিলেন এবং অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পারিবারিক ও পুলিশি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার (৬ জুন) সকালে শহিদুল প্রতিদিনের মতো নিজের অটোরিকশাটি নিয়ে ভাড়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু দিন পার হয়ে রাত গভীর হলেও তিনি আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করার পরও শহিদুলের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নিখোঁজের পরদিন, অর্থাৎ গত রোববার (৭ জুন) শহিদুলের ভাই শাহিদুল মাতুব্বর বাদী হয়ে মুকসুদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করেন। জিডি দায়েরের পর পুলিশ চালক শহিদুল এবং তাঁর অটোরিকশাটির সন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে।
সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে মুকসুদপুর থানা-পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় নিবিড় তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ এই নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনার সাথে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই যুবককে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন:
নুর হোসেন: মুকসুদপুর উপজেলার কমলাপুর গ্রামের আবু শেখের ছেলে।
পলাশ শেখ: একই গ্রামের কাশেম শেখের ছেলে।
গ্রেফতারের পর মুকসুদপুর থানা হেফাজতে এনে এই দুই আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে নুর হোসেন ও পলাশ শেখ অটোরিকশাটি ছিনতাই করার উদ্দেশ্যে শহিদুলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার কথা স্বীকার করে। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট ও স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার বিকালে মুকসুদপুর থানা-পুলিশের একটি বিশেষ দল রাজৈর উপজেলার পান্থাপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। সেখানে একটি নির্জন রাস্তার পাশে ঘন ঝোপের ভেতর লুকিয়ে রাখা শহিদুলের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পাঁচদিন পার হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকৃত মরদেহটি আংশিক বিকৃত ও অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল বলে পুলিশ জানায়।
নিহত শহিদুলের ভাই শাহিদুল মাতুব্বর ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধারের পর গণমাধ্যমের কাছে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শাহিদুল মাতুব্বর বলেন, ‘গত শনিবার সকালে আমার ভাই অটোরিকশা চালানোর উদ্দেশ্যে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। আমরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় জিডি করেছিলাম। পরবর্তীতে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাই যে, আমাদের গ্রামেরই নুর হোসেন ও পলাশ আমার ভাইকে ফুসলিয়ে তাদের সাথে নিয়ে গেছে। মূলত আমার ভাইয়ের নতুন অটোরিকশাটি ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই তারা সুপরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করেছিল। আমরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
মুকসুদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনার সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের বর্তমান আইনি খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও বর্তমান অবস্থা |
| ভিকটিমের পরিচয় | শহিদুল মাতুব্বর (পিতা: মৃত আব্দুল ছালাম মাতুব্বর), গ্রাম: কমলাপুর। |
| গ্রেফতারকৃত আসামী | নুর হোসেন (পিতা: আবু শেখ) এবং পলাশ শেখ (পিতা: কাশেম শেখ)। |
| বর্তমান আইনি অবস্থা | মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান। |
মুকসুদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, নিখোঁজের জিডি হওয়ার পর থেকেই পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টির তদন্ত করছিল। আসামিদের গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী রাজৈর উপজেলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। অটোরিকশাটি উদ্ধার এবং এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশি অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।