খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি সুপরিচিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার’ (আইএসপি) কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের একটি দল আকস্মিক হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং নগদ মালামাল লুটপাট চালিয়েছে। হামলার সময় মুখোশধারী ওই অপরাধীরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের শনাক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ এবং মামলার এজাহার থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৯টার দিকে লালমাটিয়ার ই-ব্লকের একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত ‘ডট ইন্টারনেট’ নামক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে এই দুর্ধর্ষ হামলার ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সময় আচমকা ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল জোরপূর্বক কার্যালয়ের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। হামলাকারীদের অধিকাংশেরই মুখমণ্ডল মুখোশে ঢাকা ছিল।
কার্যালয়ে প্রবেশ করেই তারা প্রতিষ্ঠানের মূল মালিক প্রদীপ ঢালী এবং অংশীদার ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) মো. মিঠু হাওলাদারকে সুনির্দিষ্টভাবে খুঁজতে থাকে এবং উচ্চস্বরে তাদের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে। ওই সময় কার্যালয়ে দায়িত্বরত অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. ইব্রাহিম হাওলাদার এবং ইলেকট্রিশিয়ান মো. জালাল সামনে এগিয়ে আসেন। তারা বহিরাগতদের পরিচয় এবং অফিসে বিনা অনুমতিতে প্রবেশের কারণ জানতে চাইলে হামলাকারীরা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে দায়িত্বরত ওই দুই কর্মীর ওপর চড়াও হয়। এলোপাতাড়ি মারধরের কারণে অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার ও ইলেকট্রিশিয়ান দুজনেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান। পরবর্তীতে সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
হামলাকারীরা কেবল মারধর ও ভাঙচুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কার্যালয়ের মূল্যবান প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা অফিস তছনছ করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সংবলিত একটি কম্পিউটার সিপিইউ (সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট), প্রতিষ্ঠানের সংযোগ সচল রাখার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াই-ফাই রাউটার এবং কর্মীদের ব্যবহৃত একটি দামী মোবাইল ফোন জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
ক্ষয়ক্ষতি ও লুটের আর্থিক খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
লুট হওয়া সামগ্রী: কম্পিউটার সিপিইউ, ওয়াই-ফাই রাউটার ও মোবাইল ফোন।
আনুমানিক আর্থিক মূল্য: ডট ইন্টারনেট কর্তৃপক্ষের হিসাব ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, লুট হওয়া মালামালের আনুমানিক বাজার মূল্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি: কার্যালয়ের ভেতরের আসবাবপত্র, অ্যাকাউন্টস বিভাগের নথিপত্র এবং কাচের নান্দনিক অবকাঠামো ভাঙচুর করার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের পরিবেশ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বর্বরোচিত হামলার একটি সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন) ক্যামেরার ফুটেজ পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত জনসমক্ষে আসে। সিসিটিভি ফুটেজটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি অফিসে ঢুকে সরাসরি অ্যাকাউন্টস বিভাগে প্রবেশ করে। সেখানে গ্রাহকের সঙ্গে দাপ্তরিক কাজ ও কথা বলার সময় অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার ইব্রাহিম হাওলাদারকে ধরে অত্যন্ত নির্মমভাবে মারধর করা হয়। মারধরের পর অন্য কর্মীদের অফিস থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে হামলাকারীরা চলে যায়। ফুটেজে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে তা হলো—হামলার পুরো ঘটনাটি একজন হামলাকারী তার নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে লাইভ বা সরাসরি অন্য কোনো ব্যক্তিকে দেখাচ্ছিলেন।
এই ঘটনার পর ডট ইন্টারনেটের কর্পোরেট কো-অর্ডিনেটর কর্মকর্তা সগীর হোসেন আসিফ বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামী করে একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বুধবার রাতে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ডট ইন্টারনেটের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজটি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করছে। ভিডিও কলে থাকা ব্যক্তি এবং মুখোশধারী মূল অপরাধীদের নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।