খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ আগস্ট ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে সব সময় চুক্তির মধ্যস্থতায় পারদর্শী হিসেবে তুলে ধরেন। গত শুক্রবার আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগেও তিনি দাবি করেছিলেন, পুতিন তাঁকে অনেক গুরুত্ব দেন এবং তাই ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। তবে বাস্তবে বৈঠকে ট্রাম্প কিছুটা খালি হাতেই ফিরেছেন।
পুতিন শুরু থেকেই তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। ইউক্রেনের চার অঞ্চল—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিজঝিয়া ও খেরসনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিতে তিনি ছাড় দেননি। রাশিয়া সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকলেও এত দিন কেবল লুহানস্ক অঞ্চলের প্রায় পুরোটা দখল করতে পেরেছে। তা সত্ত্বেও পুতিন তাঁর অবস্থান থেকে নড়েননি।
বৈঠকের কয়েক দিন আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়ার অর্থনীতি মন্দায় পড়েছে এবং তেলের দাম কমে যাওয়ায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। তবু পুতিন তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনেননি। ট্রাম্পের দেওয়া ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রস্তাবে সম্মতি দিলেও পুতিন তা মানেননি।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—যদি যুদ্ধবিরতি না হয়, রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আসবে। কিন্তু বৈঠক আয়োজনের তাড়াহুড়ো এবং প্রস্তুতির ঘাটতিতে শেষ পর্যন্ত আলোচনা নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যায়। দুই প্রতিনিধিদলের জন্য নির্ধারিত মধ্যাহ্নভোজও বাতিল হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যদিও দাবি করেন, ‘আলোচনায় আমরা অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি’ এবং এটিকে তিনি ‘ফলপ্রসূ’ বলেছেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সমঝোতার কথা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি। বরং সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।
অন্যদিকে পুতিন জানান, যুদ্ধবিরতির আগে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি করতে হবে। তবে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়ে তিনি বলেন, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—অর্থাৎ দনবাস অঞ্চল থেকে ইউক্রেন সেনা প্রত্যাহার করলে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা আর বাড়াবে না। এতে দীর্ঘ যুদ্ধের পরও দখল করতে না পারা ভূখণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ মিলবে রাশিয়ার।
আজ সোমবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন জেলেনস্কি। পুতিনের প্রস্তাবে তিনি সম্মতি না দিলে সহজেই বলা যাবে—ট্রাম্পই তাঁকে চাপে ফেলতে চাইছেন। এতে ইউরোপকেও অবস্থান নিতে হবে। আর যদি ট্রাম্প ব্যর্থ হন, পুতিন তখন জেলেনস্কিকেই শান্তির পথে প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন—বৈঠক ব্যর্থ হলে আর কোনো আলোচনা হবে না। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে আবার আলোচনায় বসবেন। পুতিনও এতে সম্মতি জানিয়েছেন এবং নতুন বৈঠকের স্থান হিসেবে মস্কোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে জেলেনস্কি বা ইউরোপীয় নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি।
অ্যাঙ্কোরেজ বৈঠকে উপস্থিত থেকে পুতিন দেখিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে একঘরে করার পশ্চিমা কৌশল ব্যর্থ। আর পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতি নয়—এই শর্তে ট্রাম্প সম্মত হওয়ায় ইউক্রেন ও ইউরোপ তাঁর ওপর আরও অবিশ্বাসী হবে। এটাই পুতিনের কূটনৈতিক সাফল্য।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেছে, যা পুতিনকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে সহায়তার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। এখন রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে গেছে। ট্রাম্প মনে করেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ইউরোপীয় দেশগুলোর দায়িত্ব।
ইউরোপ ইতিমধ্যে সহায়তা বাড়ালেও তাদের আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যদিকে পুতিনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা ট্রাম্পকে এই ভ্রান্ত ধারণা দিতে পারে যে কূটনৈতিক সংলাপ ও তাঁর মধ্যস্থতার ক্ষমতাই যুদ্ধ থামাবে। আর এটিই হয়তো তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বপ্নের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
খবরওয়ালা/শরিফ