আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঝিনাইদহসহ আশপাশের জেলাগুলোতে জাল নোটের কারবার আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাজারে কেনাবেচা বাড়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো বিভিন্ন উপায়ে নকল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বর এলাকার ফল ব্যবসায়ী কাওসার আলী সম্প্রতি এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, ইফতারের কিছুক্ষণ আগে দুই যুবক মোটরসাইকেলে করে তার আড়তে এসে প্রায় আড়াই হাজার টাকার ফল কেনেন। টাকা নেওয়ার পর আড়তের মালিক নোটগুলো যাচাই করে দেখেন, দেওয়া দুইটি এক হাজার টাকার নোটই জাল। পরে বুঝতে পারেন, ওই দুই যুবক পরিকল্পিতভাবেই জাল নোট দিয়ে ফল কিনে চলে গেছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে বাজারে নগদ লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় জাল নোট চক্রগুলো এ সময়কে লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এসব নকল নোট এতটাই নিখুঁত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জাল নোটের কারবার শুধু সরাসরি লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নেই; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এ কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে শতাধিক পেজ খুলে জাল নোট বিক্রির লোভনীয় অফার দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতাদের হাতে এসব নকল টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, এক লাখ টাকার জাল নোট মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব চক্র ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট পর্যন্ত সরবরাহ করছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জাল নোট বিক্রির হার | ১ লাখ টাকার নকল নোট ২০–২৫ হাজার টাকায় |
| বেশি ব্যবহৃত নোট | ৫০০ ও ১০০০ টাকা |
| বিক্রির মাধ্যম | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কুরিয়ার সার্ভিস |
| লক্ষ্যবস্তু | ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে কিছু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ঈদের সময় পোশাক, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ায় হাটবাজার ও বিপণিবিতানে লেনদেনের সময় জাল নোট চালানোর ঘটনা বেশি ঘটে। ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা ও তাড়াহুড়োর সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা বিশেষ করে বড় অঙ্কের নোট চালিয়ে দেয়।
ঝিনাইদহ শহরের কেপি বসু সড়কের কাপড় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এক ব্যক্তি তার দোকান থেকে সাত হাজার টাকার দুটি শাড়ি কেনেন এবং সবগুলো নতুন নোটে মূল্য পরিশোধ করেন। পরে হিসাব করার সময় দেখা যায়, মোট টাকার মধ্যে চার হাজার টাকাই জাল।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, জাতীয় পর্যায়ের উৎসব এলেই জাল নোটের ব্যবহার বেড়ে যায়। চক্রগুলো মূলত ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে, কারণ তারা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে নোট ভালোভাবে যাচাই করতে পারেন না।
অন্যদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আসল নোটে জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা এবং রং পরিবর্তনশীল কালি থাকে—এসব বৈশিষ্ট লক্ষ্য করলে জাল নোট শনাক্ত করা সম্ভব। তবে ঈদের ব্যস্ততার সময় নোট যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জাল নোটের বিজ্ঞাপনদাতাদের শনাক্ত করতে সাইবার টিম কাজ করছে এবং কয়েকটি প্রতারক চক্রের তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। শিগগিরই অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।