আফতাব তাজ
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
গত ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল গত ২১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। এবার গড় পাসের হার মাত্র ৫৮ শতাংশ, যা দেশের সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে সবচেয়ে নিম্ন হার। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২০২টি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় একজনও পাস করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর পড়াশোনার মান, শিক্ষক উপস্থিতি ও একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রশাসনেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ফলাফল প্রকাশের একই সময়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, এমন হতাশাজনক ফলাফল কি তাদের চলমান আন্দোলনে কোনো প্রভাব ফেলবে না? যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কি এই ব্যর্থতার দায় নেবেন না?
শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি অবশ্যই যৌক্তিক, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল মানের দায়ও শিক্ষক সমাজের এড়ানোর সুযোগ নেই।
এখনও অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে মনোযোগী নন, বরং প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংকেন্দ্রিক শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবারের ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ের খারাপ ফলই সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ইংরেজি শিক্ষকদের মনোযোগের ঘাটতি স্পষ্ট।
একজন শিক্ষাবিদ বলেন, ‘শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির প্রতি আমাদের পূর্ণ সহানুভূতি আছে, কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়নে তাঁদের দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দাবি ও দায়—দুটোকেই ভারসাম্যপূর্ণভাবে দেখতে হবে।’
এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাকার্যক্রমে মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় প্রজেক্টভিত্তিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই তদারকি কাজ চালানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তাদের অনেকেই নামমাত্র স্কুল পরিদর্শন করেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে ঘুষ আদায়ের ঘটনাও ঘটে। এর ফলে প্রকৃত একাডেমিক উন্নয়ন বা দুর্বল প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার কার্যকর প্রক্রিয়া প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক সংগঠনগুলো বলছে, শুধু শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হলেই দায় তাদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পরিবেশ এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকির ঘাটতিই এই নিম্ন ফলাফলের মূল কারণ।
কলেজগুলোর গভর্নিং বডি নামমাত্র কার্যকর; তারা মাঝে মাঝে প্রিন্সিপালকে দাওয়াত দিলে কলেজে এসে চা-সিঙ্গারা খাওয়া বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে তেল দেওয়ার মতো কাজ ছাড়া কার্যকর তদারকি করে না।
এইচএসসি পরীক্ষার এই নিম্ন ফলাফল কেবল সংখ্যার ব্যর্থতা নয়, এটি গোটা শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত দুর্বলতার প্রতিফলন। শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
খবরওয়ালা/এমএজেড