এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে শিক্ষা খাত এত দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সংকটে আগে কখনো পড়েনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংকটের উৎস ছিল দুটি—একটি বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস, অন্যটি ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থার অধীনে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক অরাজকতা। প্রথমটি ছিল অনিবার্য দুর্যোগ; দ্বিতীয়টি ছিল নীতিগত সিদ্ধান্ত, নীরবতা ও প্রশ্রয়ের ফল। তাই প্রশ্নটি কেবল আবেগের নয়—বাস্তবতারও: শিক্ষা খাতের গভীরতম ক্ষতটি কে সৃষ্টি করেছে?
করোনা মহামারির সময় প্রায় দুই বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। প্রায় ৩.৭ কোটি শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বাইরে চলে যায়। “জুম”, টেলিভিশন ক্লাস কিংবা অন্যান্য অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ডিজিটাল অভ্যস্ততার কারণে সেই প্রচেষ্টা আংশিকই সফল হয়।
পরিসংখ্যান বলছে—মহামারি-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ ছেলে শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে স্কুলে ফেরেনি; মেয়েদের ড্রপআউট হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। অর্থনৈতিক চাপে শিশু শ্রম ও বাল্যবিবাহ বেড়েছে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ভয়াবহ সামাজিক অভিঘাত।
তবে এই সংকট ছিল বৈশ্বিক। উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব দেশই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুনরুদ্ধারও শুরু হয়। ২০২৪ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও নিয়মিত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হয়, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ে, শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। অর্থাৎ ক্ষতি ছিল গভীর, কিন্তু পুনর্গঠনের পথ খোলা ছিল।
২০২৪ সালে ড. ইউনুস ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষা খাতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা সাময়িক বিপর্যয়কে ছাড়িয়ে কাঠামোগত অবক্ষয়ে রূপ নেয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে “মব সংস্কৃতি” দ্রুত বিস্তার লাভ করে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ঘেরাও, শারীরিক নিগ্রহ, সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার, পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা—এসব স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হয়।
এই প্রবণতা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট ছিল। বরং নানা পর্যায়ে বিশৃঙ্খলাকে নীরব বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। শিক্ষক সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা স্থায়ী রূপ নেয়। ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হারান। আন্দোলনের নামে নিয়মিত পাঠদান বন্ধ হওয়া যেন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে, পাঠের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পায়, এবং সবচেয়ে বড় আঘাত আসে আইনশৃঙ্খলার ধারণায়।
শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নাগরিক গঠনের ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তিই নড়ে যায়। বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার নৈতিক শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মকর্তা মানসিক চাপে কাজ করেছেন, অনেকে কেবল চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য নীরব থেকেছেন। কোনো মহামারির সময়ও শিক্ষা খাতে এমন মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস দেখা যায়নি।
অথচ ড. ইউনুস ছাত্রদের সামনে রেখে আন্দোলন করিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। তাঁর পক্ষে খুবই সহজ ছিল সেই ছাত্রদের মাধ্যমেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষাব্যবস্থা পুনরায় সচল করা। তিনি সেই রাস্তায় একেবারেই হাঁটেননি। বরং তাঁর সরকারের নানা অংশ থেকে বিশৃঙ্খলাকে নিয়মিত প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব গঠন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা হয়েছে।
পাঠ্যবই বিতরণে বিলম্ব, আন্দোলনের চাপে সিদ্ধান্ত বদল—এসব ছিল প্রশাসনিক দুর্বলতার লক্ষণ। কিন্তু সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো—প্রফেসর ইউনুস একবারও প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে, নিয়মিত পড়াশোনায় মন দিতে, ভবিষ্যৎ গড়তে আহ্বান জানাননি। ক্ষমতায় আরোহনের সময়ে ছাত্রদের সামনে রেখে যে নৈতিক ভাষ্য নির্মিত হয়েছিল, তা শাসনকালে প্রতিফলিত হয়নি।
প্রফেসর ইউনুস একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী, উচ্চশিক্ষিত হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি। তিনি তো লেখাপড়া না জানা রাজনীতিবিদদের মতো শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ কোনো ব্যক্তি নন। তাঁর তো জানা থাকার কথা, এই মব সংস্কৃতি কীভাবে এই জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করার সূচনা করছে। কিন্তু তাঁর কোনো সিদ্ধান্তে সেই বোধের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
করোনার ক্ষতি ছিল দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য। পাঠ্যসূচি সমন্বয়, অতিরিক্ত ক্লাস, পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে তা আংশিক পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু শিক্ষকের মর্যাদা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলার সংস্কৃতি একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রতিক অরাজকতা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির বীজ বপন করেছে—যার প্রভাব প্রজন্মজুড়ে বিস্তৃত হতে পারে।
প্রায় দুই বছরের বিশৃঙ্খলার পর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আবু নছর মুহাম্মদ এহসানুল হক মিলন—যাঁর পূর্ববর্তী মেয়াদে (২০০১–২০০৬) শিক্ষা খাতে কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ আজও স্মরণীয়। ফলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে প্রত্যাশা জেগেছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট: মব সংস্কৃতির অবসান, শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শৃঙ্খলা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা। শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়, জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা এখন সময়ের দাবী।
লেখক : এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সাংবাদিক, লেখক ও সমাজকর্মী
সম্পাদক, খবরওয়ালা