খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, স্বনামধন্য কবি ও প্রথিতযশা পত্রিকা সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ছিলেন নীতিবোধ, মানবিক দর্শন ও প্রাঞ্জল ভাষার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল জীবনবোধ ও আত্মজিজ্ঞাসা, তেমনি ছিল দর্শনের গভীরতা ও লোকজ প্রজ্ঞার সহজ প্রকাশ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১০ জুন ১৮৩৪ সালে খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে। পিতা মাণিক্যচন্দ্র মজুমদার। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাঁর পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি বরিশালের কীর্তিপাশা জমিদারের অর্থানুকূল্যে জীবনযাপন করেন। কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জন্মভূমির নিকটবর্তী সেনহাটি গ্রামে ১৯১৪ সালে ‘কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়—যা আজও তাঁর স্মৃতিকে বহন করে চলেছে।
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ১৮৫৪ সালে বরিশালের কীর্তিপাশা বাংলা বিদ্যালয়ে প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার নর্মাল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ১৮৬০ সালে তিনি সে চাকরি ত্যাগ করে মডেল স্কুলে যোগ দেন। এভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি দীর্ঘ উনিশ বছর শিক্ষকতা করেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর মানসগঠনে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘সদ্ভাব শতক’। এই গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা নীতিমূলক এবং সুফি কবি ও হাফিজের ফারসি কবিতার অনুকরণে রচিত। তাঁর কবিতায় নৈতিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এক অপূর্ব সমন্বয়ে ধরা দিয়েছে।
শৈশবে তাঁর ছদ্মনাম ছিল রামচন্দ্র দাস, সংক্ষেপে রাম। পরিণত বয়সে তিনি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘রামের ইতিবৃত্ত’ রচনা করেন। মহাভারতের ‘বাসব–নহুষ–সংবাদ’ অবলম্বনে রচিত তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘মোহভোগ’। দর্শনচর্চায় তাঁর অবদান হিসেবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘কৈবল্যতত্ত্ব’। তাঁর নাটক ‘রাবণবধ’ মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। গবেষকদের মতে, তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পনেরোটি।
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের রচনা ছিল প্রসাদগুণসম্পন্ন। তাঁর বহু কবিতার পংক্তি কালক্রমে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে। যেমন—
“চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে”
অথবা—
“কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?”
এই পংক্তিধারী কবিতাটি একসময় স্কুলপাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল—যা তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের প্রমাণ বহন করে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৬০ সালে তিনি মাসিক ‘মনোরঞ্জিকা’ ও ‘কবিতা কুসুমাবলী’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৮৬১ সালে ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তিনি এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মালিকপক্ষের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ১৮৬৫ সালে ‘বিজ্ঞাপনী’ পত্রিকার সম্পাদক হন। দেড় বছর পর পুনরায় তিনি ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক পদে প্রত্যাবর্তন করেন। পরবর্তীতে অসুস্থতার কারণে সাংবাদিকতা ছেড়ে কিছুদিন পুনরায় শিক্ষকতায় যুক্ত হন।
১৮৮৬ সালে যশোর থেকে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘দ্বৈভাষিকী’ নামক একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন—যা তৎকালীন সাহিত্য ও ভাষাচর্চায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
জীবনের শেষ পর্যায়ে কবি নিজ গ্রাম সেনহাটিতে বসবাস করেন। সেখানে তিনি সঙ্গীত রচনা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে অবসর জীবন কাটান।
১৩ জানুয়ারি ১৯০৭ সালে এই প্রথিতযশা কবি ও সাহিত্যসেবক পরলোকগমন করেন।
তাঁর কবিতা, চিন্তা ও জীবনবোধ আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণার উৎস।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।