খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত চামড়াশিল্পকে গতিশীল রাখতে এবং আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক সার্কুলারে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত পশুর চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণ, বিপণন এবং এ খাতে অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক তার বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে যে, চামড়াশিল্প সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামালনির্ভর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (GDP), ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রেও এই খাতের অনবদ্য অবদান রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত মোট কাঁচামালের একটি সিংহভাগই আসে পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির পশুর চামড়া থেকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এই নির্দিষ্ট সময়ে যদি চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা যায়, তবে চামড়া ক্রয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তা সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে এই জাতীয় সম্পদের অপচয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আসন্ন কোরবানির মৌসুমে ব্যবসায়ীদের আর্থিক তারল্য বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকসমূহকে নিম্নোক্ত নির্দেশনাগুলো পালনের আদেশ দিয়েছে:
চলতি মূলধন ঋণ সীমা: ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট চামড়া ব্যবসায়ীদের অনুকূলে দ্রুত চলতি মূলধন (Working Capital) ঋণ সীমা মঞ্জুর ও তা বিতরণ করতে হবে।
বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব: ব্যাংকগুলোকে কেবল ঋণ অনুমোদন করেই দায়িত্ব শেষ না করে, তা মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে ঋণ সুবিধা পেতে পারেন, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে।
অর্থপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ: চামড়া সংগ্রহের প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে আড়তদার ও ট্যানারি মালিক পর্যন্ত যেন অর্থের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
চামড়া ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বড় ধরনের নীতিগত শিথিলতা ঘোষণা করেছে। সাধারণত পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ক্ষেত্রে নতুন ঋণ নিতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (Compromised Amount) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে:
যেসব ব্যবসায়ীর পূর্বে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন ঋণ সুবিধার বিপরীতে কম্প্রোমাইজড অর্থ আদায়ের শর্তটি সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে।
এই বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর ফলে ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ীরাও নতুন করে ঋণ নিয়ে কাঁচা চামড়া ক্রয় কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
২০২৬ সালের কোরবানির মৌসুমের জন্য ব্যাংকগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে স্পষ্ট করা হয়েছে যে: ১. এই লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই ২০২৫ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়া চলবে না। ২. নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, সেই তথ্য একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে আগামী ৩১ জুলাই, ২০২৬ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে যে, এই নির্দেশনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের চামড়া খাতের উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক গতি সঞ্চার হবে। এটি কেবল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, বরং এই খাতের সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যথাযথ অর্থায়নের ফলে চামড়া পাচার রোধ এবং কাঁচা চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর ফলে আসন্ন ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অর্থসংকট অনেকাংশেই লাঘব হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সকল বাণিজ্যিক ব্যাংককে এই নির্দেশনাসমূহ গুরুত্বের সাথে পালন করার জন্য কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।