খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
একসময় মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে দুশ্চিন্তায় দিন কাটত বাবা–মায়ের। বয়স বাড়লেও অন্য শিশুদের মতো শারীরিকভাবে বেড়ে উঠছিল না চৈতী রানী দেব। হাত–পা ছোট, উচ্চতা থমকে যাওয়া—শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, চৈতী খর্বাকৃতির (বামনত্বে আক্রান্ত)। সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই শুরু হয় সংগ্রামের জীবন। কিন্তু আজ সেই চৈতীই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন ইতিহাস লিখে দিয়েছে, এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর গ্রামের কৃষক সত্য দেব ও গৃহিণী শিলু রানী দেবের ছোট মেয়ে চৈতীর বয়স মাত্র ১৩ বছর। উচ্চতা ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি হলেও তার স্বপ্ন ও প্রত্যয় আকাশছোঁয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫–এ অংশ নিয়ে চৈতী বর্শা নিক্ষেপ ও ১০০ মিটার দৌড়ে জিতে নেয় দুটি স্বর্ণপদক। ৭ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা চলেছে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স (শি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী শারমিন ফারহানা চৌধুরী দুবাই থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
একসময় গ্রামবাসীর চোখে চৈতী ছিল শুধুই খর্বাকৃতির এক শিশু। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্রীড়াপ্রতিভা ছিল সবার অজানা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলেছে। এখন গ্রামবাসী খোঁজ নেয়, শিক্ষকরা উৎসাহ দেন, স্কুলে সে হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। ভূনবীর দশরথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্রী আজ ‘তারকা’।
গত মাসে সাভারের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে এক মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ নেয় চৈতী। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কঠোর অনুশীলনে নিজেকে প্রস্তুত করেছে সে। এমনকি অনুশীলনের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০০ গ্রাম ওজনের বর্শা বাজারে না পেয়ে প্রশিক্ষকেরা নিজেরাই তৈরি করেন। জাতীয় প্যারালিম্পিক কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ শেষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেয় চৈতী।
এর আগেও সে জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ে। গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ইয়ুথ প্যারা গেমসে ১০০ মিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হয় চৈতী। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতাই এবার আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকে রূপ নেয়।
চৈতীর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়, দেশের প্যারা ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও ঐতিহাসিক। জাতীয় প্যারালিম্পিক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এবারই প্রথম এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে অংশ নেয় এবং সাফল্যের সূচনা করে চৈতীর হাত ধরেই।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বয়স | ১৩ বছর |
| উচ্চতা | ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি |
| প্রতিযোগিতা | এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫ |
| স্থান | দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত |
| ইভেন্ট | বর্শা নিক্ষেপ, ১০০ মিটার দৌড় |
| পদক | ২টি স্বর্ণপদক |
| বিশেষ অর্জন | প্যারা স্পোর্টসে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণ |
চৈতীর মা শিলু রানী দেব বলেন, একসময় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় ভুগতেন তিনি। আজ সেই মেয়েই দেশের গর্ব। চৈতীর স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই—খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা শেষ করে সে হতে চায় একজন চিকিৎসক। সবার বিশ্বাস, যে মেয়েটি প্রমাণ করেছে উচ্চতা নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে বড় করে, সে তার স্বপ্নও একদিন পূরণ করবেই।