খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 19শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৪ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ দফা শর্ত ঘোষণা করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল ও হামাস—দু’পক্ষই এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। তবে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক সংশয় বিরাজ করছে। তাদের ধারণা, শান্তির কথা বলে যে পরিকল্পনাগুলো উত্থাপিত হচ্ছে, তার আড়ালে থাকতে পারে গাজার রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বৃহৎ নীলনকশা।
ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে অনেক বিশ্লেষক ‘দ্বিতীয় দুবাই তৈরির স্বপ্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের যুক্তি, গাজা ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এটি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানে একটি বড় বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তি বিশাল সুবিধা পাবে। পাশাপাশি ইসরায়েলের নিরাপত্তাও জোরদার হবে।
পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত ধারা হলো ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন। এতে নজরদারির দায়িত্বে থাকার কথা বলা হয়েছে ট্রাম্প ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো নেতাদের। সমালোচকদের মতে, যদি বোর্ড কার্যকর হয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একমুখী ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে ইসরায়েলের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে এবং ফিলিস্তিনি স্ব-নির্ণয়ের অধিকার সীমিত হবে।
শর্তগুলোর মধ্যে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও তাদের ঘাঁটি উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে। গাজায় একটি অন্তর্বর্তী আন্তর্জাতিক সরকার গঠনের প্রস্তাবও এসেছে, তবে ওই সরকারের কাঠামো বা প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী গাজায় মোতায়েন হয়ে স্থানীয় পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেবে এবং সাময়িকভাবে প্রশাসনিক ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কূটনীতিকরা আশঙ্কা করছেন, এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তির হাতে চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
গাজায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো হামাস। তারা নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি ও ভৌত ভিত্তি ছাড়তে রাজি নয়। হামাস ইচ্ছুক এমন এক ব্যবস্থা সংস্কারে যেখানে গাজার নিয়ন্ত্রণ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হবে এবং এটি গঠিত হবে ইসলামী ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায়। পাশাপাশি তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবিও তুলতে পারে। অর্থাৎ, হামাসকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া বা তাদের প্রভাবশালী অবস্থান বিনষ্ট করা রাজনৈতিকভাবে জটিল এবং সামরিকভাবে কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে।
পরিকল্পনায় বন্দিমুক্তি একটি গ্রহণযোগ্য ধারা। এতে ইসরায়েলি বন্দিদের ফেরত দেওয়া হবে এবং বিনিময়ে আটক ফিলিস্তিনিদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হবে। তদুপরি, গাজার অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে—হাসপাতাল, সড়ক, পানীয়জল ও বিদ্যুৎসহ মৌলিক সুবিধা পুনর্নির্মাণ করা হবে। এতে স্বল্পকালীনভাবে জনজীবনে স্বস্তি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
গাজাকে বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। এতে বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এই বিনিয়োগ কার স্বার্থে ও কার অনুকূলে হবে। স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগণ নাকি আন্তর্জাতিক করপোরেট ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রকরা এর সুবিধাভোগী হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও স্বার্থবণ্টন ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প টেকসই হয় না, বরং নতুন প্রতিরোধ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
বিশ্বপল্লীর কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলছেন, যে কোনো বহিঃশক্তির নেতৃত্বে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া উদ্রেক হতে পারে। স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকলে চাপ, অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে মানবিক ধারা—যেমন বন্দিমুক্তি, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও আশ্রয় প্রদানে দ্রুত সহায়তা—স্বল্পমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন রয়ে গেল—এই ২০ দফা কি সত্যিকারের স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে, নাকি গাজাকে কৌশলগতভাবে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত জোনে পরিণত করার চেষ্টা মাত্র? নীলনকশার যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দেখছেন, তারা এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেন। আর যারা স্থানীয় জনগণের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেন, তারা মনে করেন, গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র ফিলিস্তিনি জনগণের হাতে থাকলে তা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর হবে, নাহলে কোনো বহিরাগত ‘শান্তি প্রকল্প’ কেবল ক্ষণস্থায়ী শান্তি দিতে পারবে।
সূত্র: আনন্দবাজারৎ
খবরওয়ালা/এন