কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পাহাড়ি ছড়া ও ফসলি জমি উজাড় করে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের এক ভয়াবহ চিত্র, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে ছড়ার বুক চিরে ২০০ ফুট চওড়া খাল খোঁড়া হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময়ে দেখা গেছে, একদল সশস্ত্র বাহিনী অপরাধীদের পাহারা দিচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে ধারণা, একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য।
স্থানীয়রা জানায়, ঘটনা ঘটেছে চকরিয়ার উত্তর হারবাং ইউনিয়নের ইছাছড়ি গ্রামে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন উপেক্ষা করে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকা ও ফসলি জমি ধ্বংস করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ি এলাকায় বালু উত্তোলনের সময় কেবল ঝুড়ি ও বেলচা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এক্সকাভেটর দিয়ে ৫০ ফুট গভীর গর্ত করা হচ্ছে। এ কারণে ছড়ার দুই তীর ধসে পড়ছে এবং স্থানীয় বাস্তুসংস্থান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বালুদস্যুরা এতটাই বেপরোয়া যে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সাংবাদিকদের পানিতে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রমাণ দেখায়, বালুখেকোদের ক্ষমতার উৎস একদমই আইনবহির্ভূত ও সন্ত্রাসী।
চকরিয়ায় ‘সাব-লিজ’ বা উপ-ইজারার সংস্কৃতি চলছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। মূল ইজারাদার দায় এড়াতে বলেছেন, তিনি অন্যকে চুক্তি দিয়েছেন। সেই তথাকথিত রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেছে। প্রশাসন সাফ জানাচ্ছে, উপ-ইজারা আইনত অনুমোদিত নয়, তবুও দিনে দিনে ট্রাক প্রতি চাঁদা দিয়ে এই অবৈধ কাজকে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এমন কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তফসিলদার থেকে জেলা প্রশাসক পর্যন্ত যারা আশ্বাস দিচ্ছেন, মাঠ পর্যায়ে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। এই অব্যবস্থার কারণে মনে হয় প্রশাসন এ বিষয়টি আংশিকভাবে উৎসাহ দিচ্ছে।
নিচে চকরিয়া উপজেলার বালু উত্তোলনের পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| অবৈধ বালু উত্তোলনের এলাকা | ইছাছড়ি গ্রাম, উত্তর হারবাং | পাহাড়ি ছড়া ও ফসলি জমি উজাড় |
| খাল খোঁড়ার প্রক্রিয়া | ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন | ২০০ ফুট চওড়া ও ৫০ ফুট গভীর |
| সশস্ত্র পাহারাদার | সক্রিয় | সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা |
| প্রশাসনের পদক্ষেপ | সীমিত ও অব্যবস্থা | তফসিলদার থেকে জেলা প্রশাসক পর্যন্ত নির্বিকার |
| আইনগত দিক | উপ-ইজারা অবৈধ | মূল ইজারাদার দায় এড়াচ্ছে |
| জরুরি ব্যবস্থা | প্রধান ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের গ্রেপ্তার | ইজারা বাতিল ও কঠোর আইন প্রয়োগ |
স্থানীয়দের মতে, নামমাত্র জরিমানা বা সীমিত অভিযান যথেষ্ট নয়। এই সশস্ত্র বালুদস্যু চক্রের মূল নেতা এবং নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা জরুরি। একই সঙ্গে ইজারার শর্ত ভঙ্গের দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইজারা বাতিল করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
চকরিয়ার এই অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশ নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্যও মারাত্মক হুমকি। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে স্থানীয় বাস্তুসংস্থান, ফসলি জমি এবং মানুষের জীবনযাত্রা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।