চার জোনে বিভক্ত হবে সেন্টমার্টিন দ্বীপ

দশকের পর দশক অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের চাপের কারণে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে সেখানে তৈরি হয়েছে মুনাফাকেন্দ্রিক হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন স্থাপনা। এ অবস্থায় দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেন্টমার্টিনকে চারটি আলাদা জোনে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়।

পরিবেশ ও বন উপদেষ্টারা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসের জন্য দ্বীপে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র কিছুটা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রবালের স্বাস্থ্য কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, বিলুপ্তির গতি কমেছে এবং স্থানীয় প্রজাতির পুনর্জন্ম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রণীত খসড়া মহাপরিকল্পনা মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বীপকে চারটি প্রধান জোনে ভাগ করা হবে:

জোনের নাম কার্যক্রম ও প্রবেশাধিকার লক্ষ্য ও নীতি
জেনারেল ইউজ জোন পর্যটন, হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনা। অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালানো ও পর্যটন নিয়ন্ত্রণ
ম্যানেজড রিসোর্স জোন কচ্ছপ প্রজনন এলাকা। পর্যটকরা দিনে ঘুরে দেখতে পারবেন, রাতে অবস্থানের অনুমতি নেই। প্রজনন এলাকা সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন
সাসটেইনেবল ইউজ জোন বুশল্যান্ড, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বন। স্থানীয় মানুষ নির্ধারিত সীমার মধ্যে সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। রাতযাপন নিষিদ্ধ। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
রেস্ট্রিক্টেড জোন কোন প্রকার প্রবেশ অনুমোদিত নয়। জীববৈচিত্র্য ও ন্যাচারাল হ্যাবিট্যাট সংরক্ষণ

মাস্টারপ্ল্যানের চারটি মূল লক্ষ্য হলো—বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সম্পদ ও জীবিকা সুরক্ষা, এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো। পরিকল্পনায় হোটেল ও রিসোর্টে জেনারেটরের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সেন্টমার্টিন ও পর্যটন সমার্থক হতে পারে না। দ্বীপের প্রথম অগ্রাধিকার হলো সংরক্ষণ। পর্যটন হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী-কেন্দ্রিক ও নিয়ন্ত্রিত। প্রতিদিন যদি আট হাজার মানুষের দ্বীপে ১০ হাজার পর্যটক প্রবেশ করে, তা স্থানীয়দের জীবন ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আমরা বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিশ্চিত করছি।”

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, “১৯৮০ সালে দ্বীপে প্রবালের বিস্তার বিশাল ছিল। বর্তমানে ৭০ শতাংশ প্রবাল নষ্ট হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব অংশ সম্প্রতি বিলীন হয়েছে। সেন্টমার্টিনে গবেষণা সব মৌসুমে হওয়া উচিত।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, “প্রকৃতিবান্ধব স্থাপনা নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি উদ্ভিদ প্রজাতি ও অতিরিক্ত লবস্টার আহরণের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।”

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দায়ারত্নে বলেন, “বৈচিত্র্যময় সেন্টমার্টিনের সংরক্ষণে যুক্ত হতে পেরে আমরা আনন্দিত। পরিকল্পনা কার্যকর হলে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।”

এই খসড়া মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও স্থানীয় জীবিকা সুরক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।