খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে চৈত্র ১৪৩২ | ২৯ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় দেশের বিমা খাতে কার্যত এক ধরনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গত ২ মার্চ সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম পদত্যাগ করার পর টানা ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে পুরো বিমা খাতের ওপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইডিআরএ একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম তদারকি, নীতিমালা প্রণয়ন এবং দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু চেয়ারম্যান বা অন্তত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান না থাকায় এই দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নতুন নীতিমালা অনুমোদন এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম কার্যত থমকে রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আইডিআরএর নিয়মিত কার্যক্রমের বড় অংশই স্থগিত রয়েছে। কেবলমাত্র কিছু নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম সীমিত আকারে পরিচালিত হয়েছে। অথচ অতীতে চেয়ারম্যান পদ শূন্য হলে সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই নতুন নিয়োগ বা অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব প্রদান করা হতো। এবার সেই প্রথা অনুসরণ করা হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এম আসলাম আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তাঁর পূর্বসূরি মোহাম্মদ জয়নুল বারী ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই দীর্ঘ শূন্যতা নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংস্থার মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান পদ খালি থাকায় আইডিআরএর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাইন উদ্দিন বলেন, “একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দীর্ঘদিন নেতৃত্ব না থাকলে খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া জরুরি।” একই ধরনের মন্তব্য করেছেন জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান। তাঁর মতে, চেয়ারম্যান না থাকায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে এবং এটি খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিমা দাবির নিষ্পত্তি। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের দাবির নিষ্পত্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে ধীরগতির হয়ে পড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে আছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং বিমা খাতের প্রতি আস্থাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিচে বর্তমান পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| চেয়ারম্যান পদ | ২৬ দিন ধরে শূন্য |
| সর্বশেষ চেয়ারম্যান | এম আসলাম আলম (পদত্যাগ: ২ মার্চ) |
| ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান | নিয়োগ দেওয়া হয়নি |
| কার্যক্রমের অবস্থা | আংশিক স্থবির |
| বকেয়া বিমা দাবি | প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা |
| নীতিনির্ধারণ কার্যক্রম | স্থগিত বা বিলম্বিত |
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ বলেছেন, চেয়ারম্যান নিয়োগে বিলম্বের কারণে খাতের ওপর নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তিনি দ্রুত এই পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, এখনো চূড়ান্ত কোনো নাম নির্ধারণ করা হয়নি। তবে শিগগিরই এ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সচিব পরিবর্তন হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। নতুন সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আইডিআরএর নেতৃত্ব সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক শূন্যতা নয়; বরং এটি দেশের বিমা খাতের স্থিতিশীলতা, গ্রাহক আস্থা এবং আর্থিক নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এখন সময়ের দাবি।