খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক যখন ৭১ হাজার কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে, ঠিক তখনই এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যকে বিপুল অংকের সুদ মওকুফ করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-কে প্রায় ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকটি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময়েই তাঁর ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তোলেন। ২০০৬ সালে জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১১ কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ দেয় জনতা ব্যাংক। মজার বিষয় হলো, তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের যে সদস্যের সময় এই ঋণ অনুমোদিত হয়েছিল, বর্তমান ২২ কোটি টাকা মওকুফের সময় তিনিই জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণের বিবর্তন ও বর্তমান চিত্র:
| বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রতিষ্ঠানের নাম | নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড |
| ব্যবস্থাপনা পরিচালক | মির্জা ফয়সাল আমিন (ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি সভাপতি) |
| প্রথম ঋণ অনুমোদন | ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর (১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা) |
| মোট দায়ের পরিমাণ | ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা |
| মওকুফকৃত সুদের পরিমাণ | ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা (প্রায় ৫০%) |
| আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা | ২২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা |
| কারখানার বর্তমান অবস্থা | ২০১১ সাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ (ডেড প্রজেক্ট) |
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মির্জা ফয়সাল আমিন রাজনৈতিক রোষানলের দোহাই দিয়ে সুদের টাকা মওকুফের আবেদন জানান। অথচ নথিপত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন ঋণের সুবিধা ভোগ করেছেন। ১৭ বছর ধরে কারখানাটি বন্ধ থাকলেও গত বছরের নভেম্বরে হঠাৎ করেই ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে মওকুফের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়। আবেদনের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিপুল অংকের এই মওকুফ প্রস্তাব অনুমোদন করে, যা ব্যাংকিং খাতের স্বাভাবিক রীতির বাইরে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশই খেলাপি। বেক্সিমকো, এস আলম ও এ্যাননটেক্সের মতো বড় গ্রুপগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে আছে ব্যাংকটির হাজার হাজার কোটি টাকা। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রায় ৫০ শতাংশ দায় মওকুফ করে দেওয়া ব্যাংকের মূলধনের ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনেই খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ব্যবসা বন্ধ রেখে রাজনৈতিক ডামাডোলে এমন বিশেষ সুবিধা নেওয়া নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের ভুল বার্তা দিচ্ছে।
জনতা ব্যাংকের আর্থিক সংকটের পরিসংখ্যান:
মোট খেলাপি ঋণ: ৭০,৬৭১ কোটি টাকা।
খেলাপির হার: ৭৩.১৮ শতাংশ।
নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি: ৪৮,০৩১ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ঋণের মানদণ্ড শিথিল করা এবং সিআইবি (CIB) প্রতিবেদনে তথ্য গোপনের এই অভিযোগ জনতা ব্যাংকের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।