জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নবাব ফয়জুন্নেসা হল থেকে এক নারী শিক্ষার্থীকে মাদক সেবনরত অবস্থায় আটক করার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে হলের ১১৬ নম্বর কক্ষে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। এ সময় কক্ষ থেকে গাঁজা, দেশি-বিদেশি মদের বোতল, ধূমপানের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মাদকসামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
আটক শিক্ষার্থী ইনিশা, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বেগম খালেদা জিয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তনুজা তিথির কক্ষে, যেটি ১১৬ নম্বর রুম হিসেবে চিহ্নিত।
কীভাবে ধরা পড়ল মাদক সেবন
প্রত্যক্ষদর্শী ও হল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্ষ থেকে অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সুমাইয়া খানম বিষয়টি হল প্রশাসনকে অবহিত করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর নবাব ফয়জুন্নেসা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে একটি দল দ্রুত সেখানে অভিযান চালায়।
অভিযান চলাকালে ইনিশাকে মাদক সেবনরত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে কক্ষ তল্লাশি করে গাঁজা, একাধিক মদের বোতল, সিগারেট, লাইটার, ধূমপানের সরঞ্জাম এবং সন্দেহজনক তরল পদার্থ জব্দ করা হয়।
জব্দকৃত সামগ্রীর বিবরণ
| জব্দকৃত সামগ্রী |
পরিমাণ/ধরন |
| গাঁজা |
উল্লেখযোগ্য পরিমাণ |
| দেশি ও বিদেশি মদ |
একাধিক বোতল |
| সিগারেট |
ব্যবহৃত ও অবশিষ্ট |
| লাইটার |
একাধিক |
| ধূমপানের সরঞ্জাম |
বিভিন্ন |
| সন্দেহজনক তরল |
পরীক্ষাধীন |
হল প্রশাসনের অবস্থান
হল সংসদের জিএস সুমাইয়া খানম বলেন, এর আগেও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বহিরাগত নিয়ে হলে প্রবেশ ও সন্দেহজনক কার্যক্রমের অভিযোগ ছিল। তিনি বলেন, “এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমরা আগেই বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। আজ তাকে হাতে-নাতে ধরা সম্ভব হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।”
নবাব ফয়জুন্নেসা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা জানান, প্রথমে তীব্র গন্ধের বিষয়টি পাওয়া যায় এবং পরে নিশ্চিত হয়ে অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ওই হলের আবাসিক নন, তাই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সুলতানা এবং সদস্য সচিব ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইয়ার হোসেন।
তদন্ত কমিটির সদস্য তালিকা
| পদ |
নাম |
| আহ্বায়ক |
অধ্যাপক ড. সুলতানা |
| সদস্য সচিব |
ইয়ার হোসেন (ডেপুটি রেজিস্ট্রার) |
| সদস্য |
রাশেদা খাতুন |
| সদস্য |
নাদিয়া সুলতানা |
| সদস্য |
শাহানাজ আক্তার |
কমিটি ঘটনাটির বিস্তারিত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্য হল প্রশাসনের বক্তব্য
বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট মঞ্জুর ইলাহি বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বর্তমানে তাদের হলে নিয়মিত অবস্থান করছেন না। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগ
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, আবাসিক হলে এমন ঘটনা শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, হলে নজরদারি ও নিয়ম-শৃঙ্খলা আরও কঠোর করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাদক সংশ্লিষ্ট এমন ঘটনা শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। তারা নিয়মিত মনিটরিং ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন।
নবাব ফয়জুন্নেসা হলে মাদক সেবনের এই ঘটনা শুধু একটি শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তের পর দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।