খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
চব্বিশের ছাত্র-জনতার মহিমান্বিত অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী বীর যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা এবং যাবতীয় অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি প্রদানের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আইনি জটিলতায় পড়ার প্রেক্ষাপটে এই বিশেষ অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিপ্লবীদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগের মূলে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা। গত ২৫ ডিসেম্বর তাহরিমা জান্নাত সুরভী এবং ৩ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে সচেতন মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। যদিও তারা পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তবে সরকার মনে করছে ভবিষ্যতে এমন হয়রানি বন্ধে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো থাকা আবশ্যক। এই দায়মুক্তির মডেল হিসেবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া আইনি সুরক্ষাকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার বিশ্বাস করে, জীবন বাজি রেখে যারা দেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে মুক্ত করেছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
নিচে জুলাই বিপ্লবীদের প্রস্তাবিত দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের তথ্যাবলি তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্যাবলি ও গুরুত্ব |
|---|---|
| অধ্যাদেশের সময়কাল | ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সকল কর্মকাণ্ড |
| আইনি কাঠামো | সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে |
| মূল লক্ষ্য | হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে আইনি ঢাল তৈরি |
| আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট | আরব বসন্ত ও সমসাময়িক বিপ্লব-পরবর্তী দায়মুক্তির অভিজ্ঞতা |
| আন্দোলনের দাবি | বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৩ দফা দাবির অন্তর্ভুক্ত |
| বিশেষ অগ্রগতি | শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট (৭ জানুয়ারি) |
| প্রশাসনিক পদক্ষেপ | আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক খসড়া অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও পর্যালোচনা |
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই প্রসঙ্গে জানান যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সৈনিকেরা অসীম সাহসিকতার মাধ্যমে দেশকে একটি অগণতান্ত্রিক ও গণধিকৃত শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই তাদের কোনোভাবেই আইনি হয়রানির শিকার হতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আরব বসন্ত বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিপ্লব-পরবর্তী সময়গুলোতে যেসব দেশে দায়মুক্তির আইন হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাগুলোও পর্যালোচনা করা হবে। এর আগে গত বছরের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তবে বর্তমান অধ্যাদেশটি সেই প্রতিশ্রুতিকে একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি প্রদান করবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আরও জানান যে, জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আগামী ৭ জানুয়ারি এর অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। একইসাথে তিনি দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে রাস্তাঘাট অবরোধ করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটালে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদকবিরোধী অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও সভায় বিশদ আলোচনা হয়েছে। এই সামগ্রিক উদ্যোগের ফলে জুলাই যোদ্ধারা যেমন আইনিভাবে নিরাপদ হবেন, তেমনি বিপ্লবের চেতনাও সংহত হবে।