খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার সেনা কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন নাকচ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। র্যাবের টিএফআই সেলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে এই বিস্তৃত মামলা চলছে, যেখানে মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ সেনা কর্মকর্তা গ্রেফতার অবস্থায় আছেন।
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ আবেদনটি খারিজ করে সশরীরে হাজিরার নির্দেশ দেন। আদালতে দিনের শুরুতেই গ্রেফতার ১০ সেনা কর্মকর্তাকে হাজির করা হয়। এরপর অভিযোগ গঠনের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অভিযোগপত্র উপস্থাপন করেন। আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট ড. তাবারক হোসেন সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন করেন।
শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীকে প্রশ্ন করে—ভার্চুয়াল হাজিরার প্রয়োজনীয়তা কী? উত্তরে অ্যাডভোকেট তাবারক জানান, “আসামিরা সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার (‘মিডিয়া ট্রায়াল’) তাদের পেশাগত ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিচার শেষে খালাস পেলে তারা সেনাবাহিনীতে ফিরে যেতে পারবেন না—এমন ভয়ই তাদের ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন করার অন্যতম কারণ।”
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে অগ্রাহ্য করে। চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা সেনা কর্মকর্তাদের বিচার করছি না, বরং তারা যে সময়ে যেখানেই কর্মরত ছিলেন—সেই দায়িত্বের প্রেক্ষিতে অভিযোগ এসেছে। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা পর্যন্ত আদালতে হাজিরা দিতে আসছেন। ভার্চুয়াল হাজিরার সুযোগ ট্রাইব্যুনাল আইনে নেই।”
চিফ প্রসিকিউটরও একই বক্তব্য দেন—ট্রাইব্যুনাল আইনে এ ধরনের সুবিধার বিধান নেই।
অ্যাডভোকেট তাবারক যুক্তি দেন, এটি আইনের প্রশ্ন নয়, বরং ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত সিদ্ধান্ত। তবে আদালত মত দেয়—আসামিরা র্যাবের দায়িত্ব পালনকালে যে অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন তা গুরুতর, সুতরাং তাদের শারীরিক উপস্থিতি অপরিহার্য।
মামলায় মোট ১৭ জন আসামির নাম রয়েছে।
গ্রেফতার ১০ সেনা কর্মকর্তা হলেন—
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম
কর্নেল কেএম আজাদ
কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন
কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান
কর্নেল মশিউর রহমান
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম
পলাতকরা হলেন—
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ আরও ৩ জন।
ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট জানায়, এই মামলার গুরুতরতা ও প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক উল্লেখ করেন, “সেনাবাহিনী বা সাধারণ জনগণ—আইনের চোখে সবাই সমান। দেশের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা যখন আদালতে হাজির হয়ে সম্মান দেখাচ্ছেন, তখন আসামিদের ভার্চুয়ালি হাজিরা প্রসঙ্গ আসে না।”
শুনানির একপর্যায়ে আদালত জানতে চায়—আইনজীবী কি ভার্চুয়াল হাজিরা শুনবেন, নাকি আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করবেন? উত্তরে তিনি সময় চান। ফলে আদালত অব্যাহতির আবেদনের শুনানির জন্য ১৪ ডিসেম্বর দিন ধার্য করে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, কারণ এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের নাম রয়েছে। একই সঙ্গে র্যাবের টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সময় ধরে বিতর্ক চলছিল। তাই মামলাটি বিশেষ নজরদারির আওতায় রয়েছে।