খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ জুন ২০২৫
দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া এক ভাষণে চমকে দেন বিশ্বকে। ৪ মার্চ তিনি ঘোষণা করেন, ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে অ্যাবি গেটে ভয়াবহ বোমা হামলার পেছনে থাকা সন্দেহভাজন আইএস-কে সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে—যার কৃতিত্ব তিনি দেন পাকিস্তান সরকারকে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এই দানবকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতার জন্য আমি পাকিস্তান সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই।’
এর পর মাত্র তিন মাস পেরোতেই, ১৮ জুন হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনীরকে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প—যিনি রাষ্ট্রপ্রধান নন, তবু সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কে এক নাটকীয় মোড়—কারণ, এই ট্রাম্পই সাত বছর আগে পাকিস্তানকে ‘মিথ্যা ও প্রতারণার কারখানা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এমনকি বাইডেনও একসময় পাকিস্তানকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ’ আখ্যা দেন।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃগঠনের আভাস মিলছে। গত মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষের সময় যুক্তরাষ্ট্র যে মধ্যস্থতার ভূমিকা নেয়, তা এই সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দেয়।
তবে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিবিদ মারভিন ওয়েইনবাম মনে করেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পুরোপুরি অনির্দেশ্য ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। এটি প্রচলিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ধারার বাইরে।’
অন্যদিকে, বিশ্লেষক রেজা আহমেদ রুমি বলেন, ‘এই বৈঠক কেবল প্রথা ভঙ্গ নয়, বরং নতুন প্রথা স্থাপন। এর মাধ্যমে বার্তা স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের চোখে পাকিস্তান এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাচ্ছে।’
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতা
এই বৈঠক এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সঙ্কটের মুখে। ১৩ জুন থেকে ইসরায়েল ও ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ইতিমধ্যে ৬০০ জন নিহত হয়েছে, আর ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরাইলে প্রাণ গেছে প্রায় ১০০ জনের।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইরান সম্পর্কে অনেক জানে, সম্ভবত অন্যদের চেয়েও বেশি।’ তিনি আরও জানান, মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সম্ভাব্য যুদ্ধ ঠেকাতে আসিম মুনীর ‘নীরব কূটনীতিতে’ বড় ভূমিকা রেখেছেন।
পরমাণু সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে
এ বছরের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরে হামলায় ২৬ জন ভারতীয় নাগরিক নিহত হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। ৭ মে ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালায়, জবাবে পাকিস্তান ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ে।
শেষ পর্যন্ত মার্কিন হস্তক্ষেপেই যুদ্ধ থামে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। ‘আমি যুদ্ধ থামিয়েছি—মুনীর ও মোদি দুজনই যুদ্ধ না চালানোর মতো বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি একটি সম্ভাব্য পরমাণু যুদ্ধ ছিল।’ যদিও ভারত বলছে, এটি ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল।
‘কৌশলগত সম্পর্ক’ না কি ‘গোপন সমঝোতা’?
রাজনীতি বিশ্লেষক আরিফ আনসার মনে করেন, পাকিস্তান যদিও সামরিকভাবে ভারতের তুলনায় ছোট, তবু তাদের দক্ষ কৌশলগত সাড়া ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনকে ‘আকর্ষণীয় প্রস্তাব’ও দেওয়া হয়েছে—রেয়ার আর্থ মিনারেলস, শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা এবং সম্ভাব্য ক্রিপ্টো বিনিয়োগ।
সেন্টকম প্রধান জেনারেল মাইকেল কুরিল্লা জানান, ‘অ্যাবি গেট হামলার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। ফিল্ড মার্শাল মুনীর নিজে ফোনে বিষয়টি আমাকে জানান।’
সামরিক দাপট না গণতন্ত্র?
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই সম্পর্ক পুনঃগঠন হচ্ছে ‘সামরিক থেকে সামরিক’ ট্র্যাকে—পাকিস্তানের বেসামরিক নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়েই।
রেজা রুমি বলেন, ‘এই দৃশ্যপট প্রমাণ করে, খাকি এখনো ব্যালটকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটা যদি নতুন মডেল হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপদ সংকেত।’
আরিফ আনসার মনে করিয়ে দেন, অতীতে এমন ‘গোপন ও ব্যক্তিনির্ভর সমঝোতা’ পাকিস্তানের জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ—দীর্ঘমেয়াদি না ক্ষণস্থায়ী?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক সবসময় ছিল সুবিধাবাদী—প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠতা, পরে উপেক্ষা। রুমি বলেন, ‘যতদিন না নিরাপত্তা ছাড়াও সম্পর্কটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, ততদিন এটিকে রাজনৈতিক রোমান্স বলা যেতে পারে—যা বাতাস বদলালেই মিলিয়ে যাবে।’
সার্বিকভাবে ট্রাম্প-মুনীর বৈঠক হয়তো নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা, তবে তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য আবারও সেনাবাহিনীর আধিপত্য বৃদ্ধির ইঙ্গিতও হতে পারে।
এই সম্পর্ক কতটা স্থায়ী হবে—তা নির্ভর করবে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ, বিশেষ করে চীন ও ইরান-সংক্রান্ত নীতির গতিপ্রকৃতির ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা
খবরওয়ালা/ এমএজেড