খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে বোমারু বিমান, স্টিলথ ফাইটার জেট, ড্রোন, নজরদারি বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানসহ মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নীতিনির্ধারণী ও আইনি তথ্য সরবরাহকারী গবেষণা সংস্থা ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’ (সিআরএস)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস (ক্লাসিফিকেশন), চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এই সংখ্যার চেয়ে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধবিরতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন প্রশাসন এই অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। আকাশ, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ৪০ দিনের মাথায়, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়। তবে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদকাল এবং স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
পেন্টাগনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, অপারেশন এপিক ফিউরির আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানের মোট ব্যয় ইতিমধ্যেই প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই ব্যয়ের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির নতুন মূল্যায়নের পর এই ব্যয় আরও ৪ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ১২ মে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন সাবকমিটির এক শুনানিতে পেন্টাগনের অর্থবিষয়ক প্রধান (অ্যাক্টিং কমপট্রোলার) জুলস হার্স্ট থ্রি আইনপ্রণেতাদের জানান, খরচ এভাবে আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর যেসব আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস বা নষ্ট হয়েছে, সেগুলো মেরামত করতে কিংবা সেগুলোর পরিবর্তে নতুন সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন করতে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ লাগবে, তার একটি নিখুঁত ও পরিমার্জিত হিসাব এখন তাদের হাতে এসেছে। ফলে সামগ্রিক যুদ্ধের ব্যয় পূর্বের প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠন এবং বিমান প্রতিস্থাপনের কারণে এই দীর্ঘমেয়াদী ব্যয়ের পরিমাণ আরও বহুগুণ বাড়তে পারে।
ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের বিবরণ
পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কোনো পূর্ণাঙ্গ বা আনুষ্ঠানিক সামগ্রিক তালিকা প্রকাশ করেনি। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বিভিন্ন বিবৃতি, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিবেদন এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনা করে এই তালিকা প্রস্তুত করেছে। সিআরএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪২টি বিমানের মধ্যে চালকবিহীন ড্রোনের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। নিচে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হওয়া বিমানের সুনির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হলো:
| বিমানের ধরন ও মডেল | বিমানের ভূমিকা/শ্রেণি | ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের সংখ্যা |
| এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল (F-15E Strike Eagle) | যুদ্ধবিমান (Fighter Jet) | ০৪টি |
| এফ-৩৫এ লাইটনিং টু (F-35A Lightning II) | অত্যাধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান | ০১টি |
| এ-১০ থান্ডারবোল্ট টু (A-10 Thunderbolt II) | গ্রাউন্ড-অ্যাটাক বা স্থল-আক্রমণকারী বিমান | ০১টি |
| কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাংকার (KC-135 Stratotanker) | আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান (Refueler) | ০৭টি |
| ই-৩ সেন্ট্রি (E-3 Sentry AWACS) | আগাম সতর্কবার্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ বিমান | ০১টি |
| এমসি-১৩০-জে কমান্ডো টু (MC-130J Commando II) | বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী পরিবহন বিমান | ০২টি |
| এইচএইচ-৬০ ডব্লিউ জলি গ্রিন টু (HH-60W Jolly Green II) | কমব্যাট সার্চ-অ্যান্ড-রেসকিউ হেলিকপ্টার | ০১টি |
| এমকিউ-৯ রিপার (MQ-9 Reaper) | মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম ড্রোন | ২৪টি |
| এমকিউ-৪সি ট্রাইটন (MQ-4C Triton) | উচ্চ উচ্চতায় দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম কৌশলগত ড্রোন | ০১টি |
| সর্বমোট | ৪২টি |
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, এই বিমানগুলোর সবকটি সরাসরি ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছু বিমান যুদ্ধকালীন অভিযানে কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনায় পড়েছে এবং কয়েকটি বিমান ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা মিত্রবাহিনীর নিজেদের ভুলের কারণেও ধ্বংস হয়েছে। যেমন, কুয়েতের আকাশে মিত্রবাহিনীর ভুল বুলেটের আঘাতে তিনটি এফ-১৫ই বিমান ধ্বংস হয় এবং ইরাকের আকাশসীমায় একটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান বিধ্বস্ত হয়।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও হুঁশিয়ারি
মার্কিন কংগ্রেসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সিআরএসের এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এপ্রিল মাসের যুদ্ধবিরতির আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে সংঘাত হয়েছে, সেখান থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত জ্ঞান অর্জন করেছে, যা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিবেদনেই প্রমাণিত।
আরাগচি মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় কোনো ধরনের সামরিক অভিযান বা আগ্রাসন শুরু করার ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তবে তেহরান তাদের পূর্ব অর্জিত এই যুদ্ধকালীন জ্ঞান ও সক্ষমতাকে পূর্ণরূপে কাজে লাগাবে। সে ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর সামনে ‘আরও অনেক বড় চমক’ বা অভাবনীয় প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর মার্কিন কংগ্রেস অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে তারা বিলিয়ন ডলার মূল্যের ডজন ডজন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। এর মাধ্যমে এটিও আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হলো যে, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীই বিশ্বের বহুল আলোচিত ও আধুনিক মার্কিন স্টিলথ ফাইটার জেট এফ-৩৫এ (F-35A) প্রথম ভূপাতিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।