বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অগ্রিম ডলার লেনদেন বা ভবিষ্যৎ নির্ধারিত দামে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে সংযম প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ ধরনের লেনদেন অতিরিক্ত বাড়লে তাৎক্ষণিক বাজারে ডলারের সরবরাহে কৃত্রিম চাপ তৈরি হতে পারে এবং এর ফলে বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর কিছু ব্যাংক অগ্রিম ডলার বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দেয় এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
অগ্রিম বৈদেশিক মুদ্রা চুক্তি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত বিনিময় হারে ক্রয় বা বিক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়। এই পদ্ধতি সাধারণত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে বিনিময় হারের ওঠানামা থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, অনুমোদিত ব্যাংকগুলো কেবল প্রকৃত গ্রাহক চাহিদার ভিত্তিতে অগ্রিম বিক্রয় করতে পারবে এবং এসব লেনদেনের উদ্দেশ্য হতে হবে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি হ্রাস করা। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব ঝুঁকি দ্রুত সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে মৌখিকভাবে পরামর্শ দিয়েছে, যেন তারা তাৎক্ষণিক বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করে অগ্রিম বিক্রয় চুক্তি পূরণ না করে। বরং অগ্রিম বিক্রয় কার্যক্রমকে নিজস্ব অগ্রিম ক্রয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করতে বলা হয়েছে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সীমিতসংখ্যক কিছু ব্যাংক অগ্রিম চুক্তি দ্রুত বাড়াচ্ছিল, যা পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারত। তিনি বলেন, “তাৎক্ষণিক বাজারে ডলারের ঘাটতি তৈরি হলে বিনিময় হার বেড়ে যায়। অতিরিক্ত অগ্রিম চুক্তি সেই চাপকে আরও বাড়াতে পারে।”
নির্দেশনার সারাংশ
| বিষয় |
করণীয় |
| অগ্রিম বিক্রয় |
প্রকৃত গ্রাহক চাহিদার ভিত্তিতে সীমিত রাখা |
| ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা |
দ্রুত দায় সমন্বয় করা |
| তাৎক্ষণিক বাজার নির্ভরতা |
অগ্রিম চুক্তি পূরণে নিরুৎসাহিত |
| অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় |
পারস্পরিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা |
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অগ্রিম চুক্তির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যদিও পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমে আসে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ বিনিময় হার নির্ধারণে আগ্রহী রয়েছে।
কিছু ব্যাংকার জানিয়েছেন, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয় বা ডলারের মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা বাড়ে, তবে অগ্রিম চুক্তির চাহিদা আবারও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাজারে প্রভাব পড়তে পারে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নির্দেশ দিয়েছে যেন অগ্রিম বিক্রয় শুধুমাত্র অগ্রিম ক্রয়ের ভিত্তিতে করা হয়। তবে অনেক ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত অগ্রিম ক্রয় না থাকায় এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একাধিক বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রিম চুক্তি করতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে, কারণ ব্যাংকগুলো নতুন নির্দেশনা মেনে চলছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে বাজারে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিনিময় হার কিছুটা কমেছে। নিলামের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ক্রয় করার পর এই স্থিতিশীলতা ফিরে আসে বলে তারা উল্লেখ করেন।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ডলারের ওপর চাপ মূলত আন্তর্জাতিক বাজার থেকেই আসছে এবং দেশের বিনিময় হারের পরিবর্তন সেই প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নীতির সঙ্গে হস্তক্ষেপের বিষয়টি একটি সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করে।
সাবেক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, অগ্রিম বৈদেশিক মুদ্রা চুক্তি একটি স্বীকৃত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। তার মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ঝুঁকি কমাতে এই পদ্ধতির প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং এই বাজারকে আরও কার্যকরভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।