রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ঘটনাটির তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ। তবে অভিযুক্ত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মারধরের শিকার রাকিবুল ইসলাম সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তাঁর দাবি, বুধবার রাতে কোতোয়ালি থানায় একটি সামাজিক বিরোধ মীমাংসার বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে থানার ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরের সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ওই যুগলকে উদ্ধারের পর বুধবার সন্ধ্যায় তাদের থানায় আনা হয়। দুই পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে রাকিবুল ইসলামও ছিলেন।
রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে নয়টার দিকে থানায় গিয়ে তিনি এক পুলিশ সদস্যকে ওই যুগলকে মারধর করতে দেখেন। এ বিষয়ে আপত্তি জানালে তাঁকে লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে তাঁকে মারধর করা হয় এবং এতে তাঁর মাথা ও চোখে আঘাত লাগে। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে রাইফেল দিয়েও আঘাত করা হয়েছে এবং তাঁর দুটি মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কোতোয়ালি থানার সামনে জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় আহত অবস্থায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম। তিনি ঘটনার বিচার দাবি করে বলেন, পরিচয় দেওয়ার পরও তাঁকে রেহাই দেওয়া হয়নি এবং পুলিশি আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তিনি থানার ভেতরে ছিলেন এবং বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি ও হাতাহাতির পরিস্থিতি দেখতে পান। তাঁর মতে, রাকিবুল ইসলাম অন্য কারও হাতে আহত হয়ে থাকতে পারেন এবং ভুলবশত পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন।
ঘটনার পর গভীর রাতে রংপুর মহানগর পুলিশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অভিযোগের প্রাথমিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক মাসুদ রানা, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা এবং কনস্টেবল লিমা সরেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ
বিষয়
তথ্য
ঘটনার স্থান
কোতোয়ালি থানা, রংপুর
ঘটনার সময়
বুধবার রাত
অভিযোগকারী
রাকিবুল ইসলাম
পরিচয়
সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব
অভিযোগ
থানার ভেতরে মারধর ও নির্যাতন
আহতের অবস্থা
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি
প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্য
৩ জন
তদন্ত কমিটির প্রধান
নরেশ চাকমা
ওসির অবস্থান
অভিযোগ অস্বীকার
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তাদের সংগঠনের নেতাকে নির্যাতনের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অন্যদিকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওসির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষের। তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে অভিযোগের সত্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক পদক্ষেপ।