খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৫৯ রানের সফল চেজ কেবল বড় ইনিংস নয়—এটি ছিল আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ‘ট্যাকটিক্যাল চেজিং’-এর এক দৃষ্টান্ত। ক্রিকেটে পরিকল্পনার সঠিক প্রয়োগ কেমন হওয়া উচিত, একটি বড় স্কোরের চাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়—প্রোটিয়ারা তার textbook উদাহরণ দিয়ে গেল।
প্রথমেই বলা দরকার—ভারতের ৩৫৮ রানের বড় স্কোরটি গড়ার মূল নায়ক ছিলেন বিরাট কোহলি এবং রুতুরাজ গায়কোয়াড়। যশস্বী ও রোহিতের দ্রুত বিদায়ের পর (২২ ও ১৪ রান) দক্ষিণ আফ্রিকা চাপ সৃষ্টি করলেও কোহলির দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে এগিয়ে নেয়ার সঠিক জ্বালানি জুগিয়েছে। কোহলি তার স্বাভাবিক রোটেশন-ভিত্তিক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি দুর্বল বলগুলোকে শাস্তি দিয়েছেন, যার ফলে তার ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ কখনোই হাতছাড়া হয়নি। অপরদিকে রুতুরাজ তার প্রথম ওয়ানডে শতক তুলে ভারতকে একাধিক গতি দিয়েছে—ইনিংস গড়তেও সাহায্য করেছে, আবার মধ্য ও শেষ ভাগে স্কোরবোর্ড তোলার কাজও সহজ করে দিয়েছে। তাদের ১৯৫ রানের জুটি ব্যতীত ভারতের এত বড় সংগ্রহ সম্ভব হত না।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা বোলিং বিশ্লেষণ করেই মাঠে নামে। প্রথম ১০ ওভারের টার্গেট ছিল ৫০–৫৫ রান, যাতে নেট রান রেট নিয়ন্ত্রণে থাকে। তারা তুলে ৫১। এরপর ২০ ওভারে লক্ষ্য ১১০–১২০, এবং তারা ১১৮ এ পৌঁছে যায়। এই কাঠামোগত পদ্ধতি ছিল কোচিং স্টাফের সুপরিকল্পিত কৌশলেরই প্রতিফলন। এমনভাবে টার্গেট ভাগ করলে খেলোয়াড়রা কখনো চাপ অনুভব করে না।
মার্করামের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। দক্ষতার সঙ্গে লেন্থ বের করে খেলা এবং ফিল্ডের ফাঁক ব্যবহারের ক্ষমতা তাকে দলের প্রধান অ্যাঙ্কর করে তোলে। ১১০ রানের ইনিংসটি মূলত ছিল কীভাবে ইনিংস তৈরি করতে হয় তার নমুনা। বাভুমাকে নিয়ে ১০১ এবং ব্রিটজকের সঙ্গে ৭০ রানের জুটি দুই সময়েই দলকে স্থির ভিত্তি দিয়েছে।
স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা ‘মিডল ওভার কন্ট্রোল’–এর ওপর জোর দেয়। ভারতীয় স্পিনারদের লাইন–লেন্থ আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবহার করা, মাঝে মাঝে ডাউন দ্যা গ্রাউন্ড গেলে বাউন্ডারির সুযোগ তৈরি হও—এসবই তাদের ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনার অংশ ছিল। এখানেই ব্রেভিস পরিণত হয়েছেন গেম–চেঞ্জারে। তাকে নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল ২৫–৩০ বলেই ম্যাচের গতি বদলানোর চেষ্টা করতে, এবং ব্রেভিস সেটি করেছেন একদম নিখুঁতভাবে। তার ৩৪ বলে ৫৪–র ইনিংসটি ভারতীয় পেসারদের সম্পূর্ণ পরিকল্পনাকে ভঙ্গ করে দেয়।
শেষ ১০ ওভারে ম্যাচ পুরোপুরি দক্ষিণ আফ্রিকার দিকেই চলে গেলেও কিছু বাধা এসেছিল—ব্রিটজকের উইকেট পতন এবং ডি জর্জির চোট। এমন পরিস্থিতিতে দল যদি মরিয়া হয়ে পড়ে, তবে ভুল করতে পারে। কিন্তু এখানে তারা ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। বশের নির্দেশ ছিল ‘ছোট ঝড়’, অর্থাৎ মাত্র ১৫–২০ রানে ম্যাচের চাপ কমানো। তিনি করলেন ১৫ বলে ২৯ রান—যা ম্যাচের ব্যবধানকে কার্যত মুছে দেয়।
ভারতীয় বোলারদের পরিকল্পনা এ ম্যাচে ব্যর্থ হয়—ব্যাক অফ লেংথে বেশি বল, ইয়র্কারের ঘাটতি এবং ডেথ ওভারে উইকেটের জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা ফলাফলকে উল্টো দিকে ঠেলে দেয়। স্পিন বিভাগেও তেমন কাটিং–এজ কিছু দেখা যায়নি।
সার্বিকভাবে, দক্ষিণ আফ্রিকা কেবল রান তাড়া করেনি; তারা একটি কৌশলগত রোডম্যাপ মেনে ম্যাচ জয় করেছে। ভারতের স্কোর ছিল প্রশংসনীয়, কোহলির সেঞ্চুরিও ঐতিহাসিক, কিন্তু ক্রিকেটে ম্যাচ জেতে দল—এবং আজ দক্ষিণ আফ্রিকার সামগ্রিক ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলাই ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল।