খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
দেশের অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিময় হারের ভারসাম্য সুরক্ষার লক্ষ্যে দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান ২০২৬ সালের ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) আধুনিক মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতি অনুসরণ করে এই বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এবং জাতীয় রপ্তানি আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশের সার্বিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের সরবরাহ বা তারল্য অনেক বেড়ে গেছে। বাজার উদ্বৃত্ত এই পরিস্থিতির সুষম সমন্বয় করতেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারিত দরে এই ২৫ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়ের এই সামগ্রিক বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাজারের তারল্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করেছে।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সর্বমোট ৬৪১ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার (যা প্রায় ৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ) ক্রয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘমেয়াদী এই ক্রয়ের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী হিসাব অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের প্রথম চার দিনেই বাজার থেকে মোট ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার (১০১ মিলিয়ন ডলার) সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তথ্যটি প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
মুদ্রাবাজারের এই নীতিগত পদক্ষেপের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্ত বাজারে মার্কিন ডলারের সরবরাহ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে স্বাভাবিক নিয়মেই ডলারের দাম অনেক বেশি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদি ডলারের বাজারমূল্য অতিরিক্ত হ্রাস পায়, তবে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তথা রপ্তানিকারক এবং প্রবাসী আয় প্রেরণকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিরুৎসাহিত হতে পারেন। মূলত এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি রোধ করতে এবং ডলারের বিনিময় হারকে একটি সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত বিরতিতে বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার সংগ্রহ করছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এর আগে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যখন বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট ও উচ্চ চাহিদা তৈরি হয়েছিল, তখন বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের নিজস্ব রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই সামষ্টিক বাজার পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটতে শুরু করে। এই অনুকূল পরিবেশের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ধীরে ধীরে বাজার থেকে ডলার কিনে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভকে পুনরায় শক্তিশালী ও সুসংহত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বাজারমুখী সিদ্ধান্তটি বর্তমান অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কেনার এই দ্বিমুখী নীতির ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৈদেশিক মুদ্রার সামগ্রিক রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনই মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হারেও একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। এটি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখার পাশাপাশি সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাহ্যিক ধাক্কা সামলাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।