খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে পৌষ ১৪৩২ | ২৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা খাতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিতর্কের নাম ‘এজেন্ট কমিশন’। ১৯৩৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই প্রথাটি বাংলাদেশে এসে রূপ নিয়েছিল এক অসম প্রতিযোগিতার হাতিয়ারে। এই প্রেক্ষাপটে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি এক সাহসী অথচ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা ‘সার্কুলার নন-লাইফ: ১০৯/২০২৫’-এর মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নন-লাইফ বীমা খাতে আর কোনো ব্যক্তি এজেন্ট থাকবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে হাজারো এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত হবে এবং কমিশনের হার নেমে আসবে শূন্যতে।
নন-লাইফ বীমায় কমিশনের সর্বোচ্চ সীমা ১৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও এটি ছিল কেবল কাগজ-কলমে। বাস্তবে কোম্পানিগুলো ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন প্রদান করত, যা ছিল এক ‘ওপেন সিক্রেট’। এই অনিয়ম রোধে ২০১২ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের মার্চে কমিশন সাময়িক স্থগিত করা হলেও প্রবল চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ প্রায় এক যুগের অস্থিরতা শেষে এখন চূড়ান্তভাবে এজেন্সি ব্যবস্থার অবসান ঘটানো হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বাজারে স্বচ্ছতা আনতে পারলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এজেন্ট প্রথা বাতিলের ফলে কেবল কর্মসংস্থান নয়, সরাসরি সরকারি রাজস্বেও বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ৩,১৩৫ জন সক্রিয় ব্যক্তি এজেন্টের লাইসেন্স নবায়ন ফি এবং তাদের আয়ের ওপর থেকে প্রাপ্ত কর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। কমিশন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হলে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিচে নন-লাইফ বীমা খাতের এজেন্ট ও রাজস্ব সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক সারণি তুলে ধরা হলো:
| সূচকের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্য |
|---|---|
| সক্রিয় ব্যক্তি এজেন্টের সংখ্যা | ৩,১৩৫ জন |
| বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন ফি (প্রতি জন) | ১,২০০ টাকা |
| ২০২৩ সালে গ্রস প্রিমিয়াম আয় | ৪,৭৫২.৩৫ কোটি টাকা |
| প্রদত্ত মোট আনুমানিক কমিশন (১৪.২৫% হারে) | ৬৭৭ কোটি টাকা (প্রায়) |
| এনবিআর-এর আনুমানিক কর রাজস্ব (৫% ট্যাক্স) | ৩৩ কোটি টাকা (প্রায়) |
| ২০২৬ সালের নীতিগত পরিবর্তন | ব্যক্তিগত এজেন্সি ও কমিশন বিলুপ্তি |
নন-লাইফ বীমায় এজেন্টরাই মূলত প্রধান বিপণন চ্যানেল হিসেবে কাজ করেন। অনেক দক্ষ পেশাদার কোনো বেতন ছাড়াই কেবল কমিশনের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা সংগ্রহ করেন। হুট করে এই চ্যানেলটি বন্ধ করে দিলে ব্যবসা সংগ্রহে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ প্রিমিয়ামের উচ্চ হার অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের কমিশন সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য সহনীয় রাখা হতো। এখন সেই পথ বন্ধ হওয়ায় বাজারে নতুন ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
আইডিআরএ-র এই সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, সলভেন্সি মার্জিন কঠোরভাবে কার্যকর করা; দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ও করপোরেট ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল দ্রুত শক্তিশালী করা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রথাটি বাতিল করার আগে একটি শক্তিশালী বিকল্প কাঠামো দাঁড় করানো না গেলে বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালনা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের এই নতুন পথচলা বাংলাদেশের বীমা শিল্পকে কতটুকু সুশৃঙ্খল করতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।