খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নরসিংদীর সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নে ধর্ষণের বিচার দাবি করায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অপহরণের পর হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (দুপুর সাড়ে ১২টা) বিলপাড় ও দড়িকান্দী গ্রামের মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছে।
নিহত কিশোরীর পরিবার কয়েক বছর ধরে মহিষাশুড়া ইউনিয়নের একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল। তার বাবা একটি টেক্সটাইল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরিবারটিতে বাবা-মা, এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিলেন। স্বল্প আয়ের এই পরিবারটি সম্প্রতি এক ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল বলে জানিয়েছে স্বজনেরা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। প্রায় ১৫ দিন আগে বাড়ি ফেরার পথে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারটির অভিযোগ, ওই সময় তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর বিচার চেয়ে তারা মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আহমদুল্লাহর কাছে যান। কিন্তু প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। বরং বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার আশ্বাস দিয়ে পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে অভিযোগ করায় অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বলে পরিবারটির অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার রাতে মেয়েকে নিরাপদ স্থানে রাখতে খালার বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন তার বাবা। রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয়জন তরুণ পথরোধ করে কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও একা কিছু করতে পারেননি তিনি।
রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও মেয়ের সন্ধান পাননি পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয়রা একটি শর্ষেখেতে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। মাধবদী থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
নিহতের বড় ভাই জানান, “আমরা মীমাংসার কথা শুনেছিলাম। এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ারও কথা বলেছিলাম। কিন্তু তার আগেই আমার বোনকে অপহরণ করে হত্যা করা হলো। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ঘটনার পর অভিযুক্ত নূরা ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ইউপি সদস্য আহমদুল্লাহকেও এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না। তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ধর্ষণের বিচার চাওয়ার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।” তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা না করে সরাসরি থানায় অভিযোগ করা উচিত।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক চাপে আপস-মীমাংসার প্রবণতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। এ ঘটনায় দ্রুত মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা না গেলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।