খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা, ভাষাসৈনিক ও শিক্ষাবিদ মমতাজউদ্দীন আহমেদ-এর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর অবদান অনন্য। বিশেষত একাঙ্ক নাটক রচনায় তিনি অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। নাট্যসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৩৪ সালের ১৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলায় তাঁর জন্ম। দেশভাগের পর পরিবার নিয়ে পূর্ববাংলায় চলে আসেন। পিতা মরহুম কলিমুদ্দিন আহমেদ এবং মাতা সখিনা বেগম। যদিও তাঁর জন্ম মালদহে, বেড়ে ওঠা ও শৈশব-কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার মাটিতে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মালদহ আইহো জুনিয়র স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৫১ সালে ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট মডেল ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী—নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কলামিস্ট, অভিনেতা ও শিক্ষক। শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ৩২ বছর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা নাটক এবং ইউরোপীয় নাট্যধারা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে পাঠদান করেছেন। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে উচ্চতর বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭-৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর নাট্যকর্ম দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। দিল্লি, জয়পুর ও কলকাতায় নাট্যদলের নেতৃত্ব দিয়ে নাটক মঞ্চায়ন করেছেন। তাঁর রচিত ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ এবং ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এর পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি নিয়মিত লিখতেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে এবং একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন-এ বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় এক অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রাতেই রাজশাহী কলেজের নিউ মুসলিম হোস্টেলের প্রধান ফটকে যে শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল, তার নির্মাতা ছিলেন মমতাজউদ্দীন আহমেদ। ভাষাশহীদদের স্মরণে সেটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার, যা পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়।
রাজনৈতিক আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে তিনি গ্রেফতার হন। পাকিস্তান আমলে তিনি ভোলাহাট উপজেলার প্রথম রাজবন্দী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং শিশু সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০১৯ সালের ২ জুন এই মহান নাট্যজন চিরবিদায় নেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম, প্রগতিশীল চিন্তা এবং নাট্যচর্চায় অবদান আজও বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।