খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার ওপর হামলা এবং তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের তিন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) পৃথক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁদের দলীয় পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দলের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে সংগঠন দুটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাস, নাশকতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইশতিয়াক আহমেদ বাবুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ বাতিল করা হয়েছে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রমতে, দলের নীতি ও আদর্শের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের সহিংস কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ইশতিয়াক আহমেদ বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় প্ররোচনা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন।
একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ পৃথক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন:
১. সাজু আহমেদ: সদস্য সচিব, পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রদল।
২. সোলায়মান কবির: সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রদল।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এই বহিষ্কারাদেশ অনুমোদন করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সোলায়মান কবিরকে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে এবং সাজু আহমেদকে তাঁর বর্তমান সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। একই সঙ্গে সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন বহিষ্কৃতদের সঙ্গে কোনো প্রকার সাংগঠনিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক বজায় রাখা না হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাত্রদলের কোনো সদস্য যদি আইনবহির্ভূত কাজে জড়িত হয়, তবে তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য যে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। নেত্রকোনা জেলায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি বা জনসভা শেষে ফেরার পথে পূর্বধলা এলাকায় এই হামলার শিকার হন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একদল দুষ্কৃতকারী তাঁর গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে গাড়ির কাঁচ ভাঙচুর করে।
হামলার সময় সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা অক্ষত থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে এই হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মীর উসকানিকে দায়ী করা হয়েছিল। পুলিশ ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চালায়।
হামলার ঘটনার পরপরই জামায়াতে ইসলামী নেত্রকোনা জেলা শাখা তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নিজেদের নেতা-কর্মীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাধারণত রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটলেও, কেন্দ্রীয়ভাবে নিজ দলের নেতাদের বহিষ্কার করার মাধ্যমে বিএনপি একটি কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা কোনো ধরনের সহিংসতাকে উৎসাহিত করবে না।
পূর্বধলা এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে একে সুশৃঙ্খল রাজনীতির ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের একাংশ এই বহিষ্কারাদেশে কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করলেও কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন।
নেত্রকোনা জেলা পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বহিষ্কৃত নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করা হলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের এই কঠোর সিদ্ধান্ত মূলত দলীয় কর্মীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড রোধে কেন্দ্রীয় কমিটি আরও বেশি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করবে।
সংক্ষেপে ঘটনার ও বহিষ্কারের সারসংক্ষেপ:
| বহিষ্কৃত নেতার নাম | পদবি ও সংগঠন | বহিষ্কারের কারণ |
| ইশতিয়াক আহমেদ বাবু | যুগ্ম আহ্বায়ক, পূর্বধলা উপজেলা বিএনপি | সন্ত্রাস ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড |
| সাজু আহমেদ | সদস্য সচিব, পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রদল | সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ |
| সোলায়মান কবির | সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, ছাত্রদল | সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতা |
| আক্রান্ত ব্যক্তি | মাছুম মোস্তফা (সংসদ সদস্য, নেত্রকোনা-৫) | গাড়ি ভাঙচুর ও হামলা |
জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান এবং পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখতে এই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞরা ধারণা করছেন। কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে, দলের ভেতরে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সাংগঠনিক উভয় ব্যবস্থাই চলমান থাকবে।