খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ মে ২০২৫
গাজার পুরো ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সোমবার (১৯ মে) এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে এবং আমরা এগিয়ে চলেছি। গাজা উপত্যকার পুরো অঞ্চল আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গাজায় অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে ‘অভূতপূর্ব হামলার’ ইঙ্গিত দিয়ে বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৯ মে) দিনভর ইসরায়েলি বাহিনী গাজা জুড়ে অন্তত ১৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। শুধু খান ইউনিসেই নিহত হয়েছেন ১১ জন, অন্যান্য এলাকায় নিহতের সংখ্যা আরও ১১।
এএফপি’র প্রতিবেদনে খান ইউনিসের পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে ‘অ্যাপোক্যালিপসের মতো’। সেখানে আহতদের বাঁচাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে লোকজন, হাসপাতালে ছুটে আসছে অ্যাম্বুলেন্স। আহত শিশুদের কেউ ট্র্যাকস্যুট পরে, কেউ রক্তাক্ত পায়ে খালি গায়ে মেঝেতে বসে আছে।
গাজা শহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সারহান বলেন, ‘পুরো শহর এখন ধ্বংসস্তূপ। প্রতিটি ভবন থেকে আগুন, গুলির শব্দ, এফ-১৬ আর হেলিকপ্টারের শব্দ একসাথে মিলছে।’
উত্তর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে ভাই হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আয়মান বাদওয়ান বলেন, ‘আমরা একেবারে বিধ্বস্ত—শরীর, মন সব ভেঙে গেছে। সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে। এখনই আন্তর্জাতিক সমাজকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।’
খাদ্য সংকট নিয়ে সতর্কতা
অন্যদিকে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেডরস আধানম গেব্রেয়েসুস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘গাজায় ২০ লাখ মানুষ অনাহারে ভুগছে। টনকে টন খাদ্য সীমান্তেই আটকে আছে, অথচ তা গন্তব্য থেকে মাত্র মিনিটখানেক দূরে।’
ইসরায়েল সীমিত পরিসরে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিলেও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটিকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলেই উল্লেখ করছে।
এই প্রসঙ্গে ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির ত্রাণ পাঠানোর বিরোধিতা করে বলেন, ‘আমাদের জিম্মিরা তো কোনো মানবিক সহায়তা পাচ্ছে না।’ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ সীমিত ত্রাণ সহায়তাকে যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করেন, ‘এই ত্রাণ কেবল বেসামরিক মানুষের জন্য। এতে আমাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন টিকে থাকবে।’
সাম্প্রতিক হামলা ও হতাহতের পরিসংখ্যান
ইসরায়েলের সর্বশেষ সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মে মাসের শুরুতে গাজার সম্পূর্ণ দখল এবং স্থানীয় জনগণকে স্থানচ্যুত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
এ পর্যন্ত সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরতে এএফপি জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় ইসরাইলের দিকের নিহত: ১,২১৮ জন (বেশিরভাগই বেসামরিক), জিম্মি করা হয়: ২৫১ জন, এখনও গাজায় আছেন: ৫৭ জন, যাদের মধ্যে ৩৪ জনকে মৃত বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
গাজায় ১৮ মার্চ থেকে ইসরাইলি নতুন আক্রমণে নিহত: ৩,১৯৩ জন, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর মোট নিহত: ৫৩,৩৩৯ জন (গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী)।
বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক চাপ, খাদ্য সংকট এবং বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল পিছিয়ে যাবে না। এই অবস্থান নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে।
সূত্র: এএফপি
খবরওয়ালা/আরডি