খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশে প্রবাসী আয়ে সংগ্রহের চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এখন প্রবাসী আয় সংগ্রহে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে এই তালিকায় এগিয়ে ছিল ইসলামী ব্যাংক, যা এখনও শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক।
দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক প্রবাসী আয় সংগ্রহে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে সম্প্রতি কৃষি ব্যাংক প্রবাসী আয় আহরণে যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, তা ব্যাংকখাতে এক নতুন চমক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষি ব্যাংকের এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে করোনাকালে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান, সারাদেশে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন। দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য আমদানির ব্যয় পরিশোধের দায়িত্ব পাওয়ায় ব্যাংকটিতে বৈদেশিক মুদ্রার স্বাভাবিক চাহিদাও তৈরি হয়েছে। এই চাহিদা পূরণের বড় উৎস হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক আয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১১ মাসে সারাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে দুই হাজার নয়শ আটান্ন কোটি ডলার। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে দুই হাজার তেষট্টি কোটি ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক সংগ্রহ করেছে ৫৫৩ কোটি ডলার, কৃষি ব্যাংক ২৭৭ কোটি ডলার এবং অগ্রণী ব্যাংক পেয়েছে ২৬৫ কোটি ডলার। জনতা ব্যাংক সংগ্রহ করেছে ১৯৭ কোটি ডলার, ব্র্যাক ব্যাংক ১৯১ কোটি ডলার, ট্রাস্ট ব্যাংক ১৬০ কোটি ডলার এবং সোনালী ব্যাংক পেয়েছে ১৪৫ কোটি ডলার। রূপালী, সিটি ও পূবালী ব্যাংক সংগ্রহ করেছে যথাক্রমে ১১০, ৮৪ এবং ৭৯ কোটি ডলার।
কৃষি ব্যাংকের সারাদেশে রয়েছে এক হাজার আটত্রিশটি শাখা ও পাঁচটি উপশাখা। দেশের অন্য কোনো ব্যাংকের এত বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নেই। আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতারা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রবাসী আয় বিতরণ করত, যার বিনিময়ে কৃষি ব্যাংক সামান্য মাশুল পেত। ২০১৮ সালে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আলী হোসেন প্রধানিয়া এই নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন। বিদেশি অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার ফলে ব্যাংকটি সরাসরি প্রবাসী আয় সংগ্রহের সুযোগ পায়।
এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে টাকার প্রবাহ বাড়াতে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করা হয়, ফলে এসব সংস্থা বিনা খরচে যেকোনো শাখায় তাদের সংগৃহীত অর্থ জমা দিতে পারছে। করোনাকালের কঠিন সময়ে সব শাখা খোলা রেখে ব্যাংকটি প্রবাসী আয়ের সেবা অব্যাহত রাখে, যার ফলে গ্রাহকদের আস্থাও বেড়েছে। উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে সাব এজেন্ট হিসেবে যুক্ত করায় সারা দেশে সেবা আরও দ্রুত ছড়িয়ে যায়।
ডলার–সংকটের সময়ে সরকারি পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলার দায়িত্ব দেওয়ায় ব্যাংকটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ কোটি ডলার সরকারি আমদানির দায় পরিশোধ করছে ব্যাংকটি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে ব্যাংকের আয়ও বেড়েছে। গত অর্থবছরে শুধুমাত্র বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসা থেকে আয় হয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা, আর চলতি অর্থবছরে এ খাতে এক হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকটি চালু করেছে একাধিক সঞ্চয় স্কিম, যার মাধ্যমে প্রায় ২২০ কোটি টাকা জমা হয়েছে। যদিও কৃষি ব্যাংক কৃষিঋণ প্রদানের কারণে লোকসান বহন করছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা দাঁড়ায় ছয় হাজার পাঁচশ তেরো কোটি টাকা, তবুও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসার মাধ্যমে এই লোকসান কমানোর চেষ্টা করছে।
কৃষি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় পাচ্ছে মালয়েশিয়ার মার্চেন্ট্রেড থেকে। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ ও রিয়া মানি, মালয়েশিয়ার সিবিএল মানি ও এনবিএল মানি, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যের এনইসি মানি, দক্ষিণ আফ্রিকার হোম রেমিট এবং যুক্তরাজ্যের ইজেড রেমিট।
ব্যাংকের আন্তর্জাতিক ও হিসাব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত বৃহৎ নেটওয়ার্কই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আগে গোপন পিন ব্যবহার করে গ্রাহকেরা অর্থ গ্রহণ করলেও এখন তাঁরা সরাসরি নিজের হিসাবে টাকা পাচ্ছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টায় এই সেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ও মানি এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে সেবা আরও সহজ হয়েছে।
খবরওয়ালা /এজে