খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 27শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১২ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফর্সা হওয়ার আশায় নকল ক্রিম ব্যবহারে মানুষ অজান্তেই ডেকে আনছে মরণব্যাধি। ভেজাল ও নকল কসমেটিকস ব্যবহারের ফলে দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিসসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি বিএসটিআই রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার ও সাভার এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনী জব্দ করে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় দেখা যায়, এসব পণ্যে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে আড়াই হাজার গুণেরও বেশি ক্ষতিকর জৈব অ্যাসিড ‘হাইড্রোকুইনোন’ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কেজি কসমেটিকস পণ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ মিলিগ্রাম হাইড্রোকুইনোন থাকতে পারে; এর বেশি হলে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এসব নকল পণ্য ব্যবহার করলে দ্রুত গায়ের রং উজ্জ্বল হলেও কিডনি ও ত্বকের ক্যানসার, লিভার ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
বিশ্বের বহু দেশে হাইড্রোকুইনোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল কসমেটিকস তৈরি ও বাজারজাত করছে। অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্য বিক্রি করে। এসব নকল পণ্যের মধ্যে নারীদের ফরসা হওয়ার ক্রিম সবচেয়ে জনপ্রিয়। অতিমাত্রায় হাইড্রোকুইনোনযুক্ত এই ক্রিমগুলো ব্যবহারে দ্রুত ত্বক উজ্জ্বল হয়, ফলে ভোক্তারা বুঝতে পারেন না এগুলো নকল। পণ্যের মোড়কে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম, লোগো ও বিবরণও হুবহু নকল করে দেওয়া হয়।
বিএসটিআই গত বুধবার চকবাজারে অভিযান চালিয়ে স্কিন ক্রিম, বেবি অয়েল, লিপস্টিক, পাউডার ও হোয়াইটেনিং ক্রিমসহ বিভিন্ন নকল প্রসাধনী জব্দ করে। বিএসটিআইয়ের পরিচালক সাইফুল ইসলাম (সিএম) বলেন, এসব পণ্য ব্যবহারে কিডনি বিকল, লিভার ক্যানসার ও ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। নকল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক এসএম ফেরদৌস আলম ভেজালবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ছাড়া জানা গেছে, এক শ্রেণির চিকিৎসক এসব নকল ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেকেই কমিশন নিয়ে পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেন। মহাখালী গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. এনামুল করিম বলেন, ফরসা হওয়ার লোভে এসব ভেজাল ক্রিম ব্যবহার করলে লিভারসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যানসার হতে পারে। দেশে এখন লিভার ও ত্বক ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।
মহাখালী ক্যানসার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, প্রতিদিন সারাদেশ থেকে বহু ক্যানসার রোগী চিকিৎসার জন্য আসছেন। ভেজাল খাদ্য ও প্রসাধনী ব্যবহারই ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ বলে তারা মনে করেন। চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা বলেন, তরুণ-তরুণীরা মুখের রং উজ্জ্বল করতে নকল ও ভেজাল ক্রিম ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। কয়েক সপ্তাহ পর ত্বক উজ্জ্বল হলেও পরবর্তীতে স্কিন ক্যানসারসহ জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের গাইনী বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি বলেন, বিষাক্ত উপাদানযুক্ত এসব ক্রিম ব্যবহারে নারীদের অসময়ে গর্ভপাত, স্তন ও ত্বক ক্যানসার এমনকি গর্ভস্থ শিশুরও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল হাসনাত বলেন, হাইড্রোকুইনোন মিশ্রিত পণ্য ব্যবহারে ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা কসমেটিকস ব্যবহার করা একেবারেই অনুচিত।
খবরওয়ালা/টিএসএন